গাযযার নিরাপত্তা নাকি ইসরায়েলকে সাহায্য?

সাইয়্যিদ জামালুদ্দীন আফগানি

গত পরশু সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে আমেরিকার নেতৃত্বে মুসলিম ও অমুসলিম দেশগুলোর ধারাবাহিক একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে “বোর্ড অফ পিস” (অর্থাৎ শান্তি কাউন্সিল) নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করা হয়েছে। এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার জন্য গত এক বছর ধরে চিন্তাভাবনা ও প্রচেষ্টা চলছিল, যা এখন বাস্তব রূপ লাভ করেছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও পরিধি কী হবে এবং এটি কতদূর বিস্তৃত হবে?

শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল যে, এই সংস্থাটি কেবল গাযযার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজ করবে এবং সেখানে চলমান রক্তপাত বন্ধ করে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করবে। কিন্তু গতকাল এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, বোর্ড অফ পিসের ভূমিকা কেবল গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদিও এই সংস্থার গঠনতন্ত্র এখনো স্পষ্ট নয়, তবে কিছু পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এর ইশতেহারের কয়েকটি পয়েন্ট সামনে এনেছে। সে অনুযায়ী বলা হচ্ছে যে, এই সংস্থাটি সারা বিশ্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেবে এবং প্রতিটি দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা করবে।

সূত্রমতে, এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার সাথে আরও পাঁচজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব থাকবেন, যাদের মধ্যে ট্রাম্পের জামাতা, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত। ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কেবল আমেরিকার কাছে। এই কাউন্সিলের সদস্যপদ পেতে এক বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে এবং এই সদস্যপদ কেবল তিন বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে যেসব দেশ বেশি অর্থ প্রদান করবে, তাদের সদস্যপদের মেয়াদ বাড়ানো হবে। কাউন্সিলে আলোচনা এবং এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষমতাও কেবল আমেরিকা ও তার প্রেসিডেন্টের হাতে থাকবে।

বর্তমানে সর্বপ্রথম ইসরায়েলকে এই সংস্থার সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ কিছু মুসলিম ও অন্যান্য দেশও সদস্যপদের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর বিপরীতে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এবং ফ্রান্স এর সদস্যপদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। রাশিয়া ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছে যে, যদি তাদের ফ্রিজ করে রাখা সম্পদগুলো মুক্ত করে দেওয়া হয় তবে তারা সদস্য হতে প্রস্তুত। অন্যদিকে চীন এই সংস্থা গঠনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সদস্যপদ গ্রহণ করেনি।

সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই শান্তি কাউন্সিল শুরুতে গাযযার জন্য একটি ‘এক্সিকিউটিভ কমিটি’ গঠন করবে, যারা গাযযার পুনর্গঠন এবং বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে ওঠার কাজ করবে। এরপর সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় হবে। এই লক্ষ্যেই পাকিস্তান সরকারও এতে শামিল হয়েছে এবং এর সদস্যপদের নথিতে গতকাল স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করা হয়েছে। এ নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিবীদ ও জন প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের সমর্থকরা মূলত শান্তি কাউন্সিল গঠনের পেছনে একটি বড় তাত্ত্বিক ভিত্তি তুলে ধরেন। তাদের মতে, জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ এতটাই ব্যর্থ হয়েছে যে, তাদের কাছে কোনো কার্যকর শক্তি নেই এবং তারা যালিমকে যুলুম থেকে আটকাতেও পারছে না। তাই এমন একটি শক্তিশালী সংস্থার প্রয়োজন ছিল যারা নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তরিক হবে। তাদের দাবি, জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল পাঁচটি দেশের হাতে, যার মধ্যে কোনো মুসলিম দেশ নেই; বরং মুসলিম দেশগুলোকে তৃতীয় শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। তাদের মতে, এর কারণ ছিল জাতিসংঘ ও তার আগে লিগ অফ নেশনস প্রতিষ্ঠার সময় মুসলিমরা সংশয় প্রকাশ করেছিল এবং এই প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে দেরি করেছিল।
তারা আরও বলছেন যে, জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্ম থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেছে ইউরোপ। তাই তারা ট্রাম্পের এই শান্তি কাউন্সিলকে সন্দেহের চোখে দেখছে। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলো দ্রুত এই প্রক্রিয়ায় যোগ দিচ্ছে যাতে অতীতের মতো আবারো তারা তৃতীয় শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে। পাকিস্তানের যোগদানের একটি কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে—সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক আগেই এতে যোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের জনগণ এবং বিশেষ করে দেশের হিতাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদেরা এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ায় যোগদান কোনো না কোনো মূল্যের বিনিময়ে হয়েছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, যেহেতু সদস্যপদের জন্য এক বিলিয়ন ডলারের শর্ত রয়েছে এবং পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা তা বহন করার মতো নয়, তাই অবশ্যই কোনো গোপন রফা হয়েছে। যার ফলে আমেরিকা বা ইসরায়েল এই অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়েছে।
গত পরশু পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেশটির বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের প্রধান মাওলানা ফযলুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন—এটি কেমন শান্তি ফোরাম? এটি গাযযায় কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে গাযযা যুদ্ধের আসল হোতা নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প, আর এরাই এই ফোরামের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব? তিনি আরও বলেন, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত না পার্লামেন্টকে আস্থায় নিয়ে করা হয়েছে, না জনগণকে জানানো হয়েছে; এমনকি মন্ত্রিসভার সদস্যরাও এ বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ বিষয়েও উদ্বিগ্ন যে, গাযযার জন্য তৈরি এই ফোরামে নেতানিয়াহু উপস্থিত থাকলেও ফিলিস্তিনের কোনো পক্ষ এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। এর মানে কি এই নয় যে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সব সম্ভাবনাকে পিষে ফেলা হচ্ছে? এর স্বপক্ষে তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে, ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর স্বরে বলেছিলেন—যদি হামাস কথা না মানে তবে একে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা হবে। আর ঠিক সেই সময় পাকিস্তানসহ সব মুসলিম দেশ চুপ ছিল; বরং এই সময়ের মধ্যেই পাকিস্তান এই ফোরামের সদস্যপদে স্বাক্ষর করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু আমেরিকা ও ইসরায়েল ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ (Resistance) দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এখন এই কাজ নতুন এই ফোরামের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে হামাসকে পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি হতে হতে পারে, যার ফলে পাকিস্তানি জনগণের মধ্যে নিজ সেনাবাহিনীর প্রতি ঘৃণা আরও বৃদ্ধি পাবে।

পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুস্তফা নওয়ায খোখার মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ইসরায়েলকে শক্তিশালী করার জন্য গঠন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো মুসলিম বিশ্বে আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রভাব আরও বাড়ানো। তিনি উদাহরণ দেন যে, যদি এই সংস্থার মূল কাজ বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা হয়, তবে কাল আমেরিকা ইরানকে নিজেদের এবং ইসরায়েলের অভিন্ন শত্রু ঘোষণা করে শান্তির নামে সেখানে সেনাবাহিনী পাঠাবে, ব্যবস্থা তছনছ করবে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবে। আর পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে এর জন্য ব্যবহার করা হবে এবং তারা এর বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারবে না।

মুস্তফা খোখারের এই বক্তব্যটি সঠিক বলেই মনে হয়, কারণ সদস্যপদ গ্রহণের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা বারবার বলছিলেন যে—পাকিস্তান এ পর্যন্ত আমেরিকার স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অতীতেও সব সময় আমেরিকার অনুগত ছিল। অথচ এখানে প্রয়োজন ছিল পাকিস্তান যেন নিজের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু তাদের আসল অগ্রাধিকার হলো আমেরিকাকে খুশি করা; চাই তার জন্য ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হোক, তাদের পদক্ষেপকে সমর্থন করতে হোক, কোনো মুসলিম দেশকে পদদলিত করতে হোক বা নিজ নাগরিকদের অন্যায় ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে হোক। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কারণে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ পাকিস্তানের মর্যাদার জন্য মারাত্মক ক্ষতি ও পতনের কারণ হতে পারে।

Exit mobile version