বেলুচিস্তান: অভ্যন্তরীণ নীতির বলিকাষ্ঠ, প্রতিবেশী দেশের পুতুল নয়! ​

✍🏻 ড. ফারহান

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তানি মিডিয়া আবারও সেই পুরনো এবং বারবার বলা দাবিগুলো সামনে নিয়ে এসেছে যে—বেলুচ সশস্ত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব নাকি আফগানিস্তানে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকেই বেলুচিস্তানের যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের আখ্যানগুলো মূলত কোনো নিরেট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং প্রোপাগাণ্ডার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। পাকিস্তানি মিডিয়ার এই অবস্থান আসলে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটকে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা, যাতে সমস্যার আসল শিকড়গুলো আড়ালেই থেকে যায়।

যদি পরিস্থিতির প্রকৃত বিশ্লেষণ করা হয়, তবে বিদ্যমান প্রমাণ এবং আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য এটাই নির্দেশ করে যে—বেলুচদের আসল নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলো খোদ বেলুচিস্তানের ভেতরেই বিদ্যমান। যুদ্ধের সংগঠন ও বিন্যাস, কার্যক্রমের তদারকি এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো সেই পরিবেশেই নেওয়া হয় যেখানে এই সমস্যার জন্ম হয়েছে।

এটি একটি স্বাভাবিক নিয়ম যে, প্রতিটি গণপ্রতিরোধ, চাই তা সুসংগঠিত হোক বা বিচ্ছিন্ন—তার নিজস্ব ভৌগোলিক ভিত্তি, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় সমর্থন থাকে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা বিশ্লেষণাত্মক দুর্বলতা এবং ইচ্ছাকৃত বিকৃতির নামান্তর। এই আখ্যানে আফগানিস্তানের নাম নেওয়া মূলত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সবসময় তাদের নিরাপত্তা ব্যর্থতা, বেলুচিস্তানে বাড়তে থাকা অস্থিরতা এবং সেনাবাহিনীর কঠোর নীতির দায় বিদেশি শক্তির ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য একদিকে জনমতকে বিভ্রান্ত করা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই ধারণা দেওয়া যে, সমস্যাটি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এতে বিদেশি হাত রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রকাশের পরিবর্তে বিশ্বকে ধোঁকা দেওয়া, রাজনৈতিক চাপ কমানো এবং বিদেশি সাহায্য পাওয়ার জন্য করা হয়।

অন্যদিকে, যদি সত্যিই বেলুচ নেতৃত্ব আফগানিস্তান থেকে সক্রিয় হতো, তবে তা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চোখ এড়িয়ে যেত না। এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক রিপোর্ট, নথিপত্র বা প্রমাণ পেশ করা হয়নি যা এই দাবিগুলোকে সত্য প্রমাণ করে। এর বিপরীতে, অধিকাংশ তদন্ত এটাই নির্দেশ করে যে—বেলুচিস্তান সংঘাত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নীতি, সামরিক আধিপত্য এবং জনগণের দাবিকে দমন করার সরাসরি ফল।

বাস্তবতা হলো, আফগানিস্তানের নাম নেওয়া সমস্যার সমাধান নয় বরং সমাধান থেকে সুপরিকল্পিতভাবে পালানোর চেষ্টা। যতক্ষণ না পাকিস্তান বেলুচিস্তানের জনগণের ন্যায্য দাবি, রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে, ততক্ষণ এ ধরনের প্রোপাগাণ্ডামূলক অভিযোগ না যুদ্ধ থামাতে পারবে, না সত্যকে বদলে দিতে পারবে। সংকটের ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে যে—সমস্যা কোয়েটা এবং ইসলামাবাদে, কাবুলে নয়।

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, বেলুচ সশস্ত্র প্রতিরোধ কোনো বিদেশি নির্দেশনার ফল নয়, বরং এটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দীর্ঘকালীন অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন, অবিচার এবং যুলুমের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। সংগ্রামের নেতৃত্ব সেখানেই রয়েছে যেখানে আঘাত লেগেছে। আর যতক্ষণ সেই ক্ষতের চিকিৎসা না করা হবে, অন্যের ওপর দোষ চাপানো বাস্তবতা থেকে পালানোর নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়।

 

Exit mobile version