ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো গৌণ বিষয় নয়। বরং আল্লাহর বিধানসমূহ বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার জন্য এগুলোকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কুরআন সমাজের নিরাপত্তা রক্ষাকে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে যে, সূরা আল-আনফালে বলা হয়েছে,
«وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ»
“তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রস্তুত রাখো।”
এ কারণেই বৈধ আমির ও ইসলামী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা ও ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃত আফগানিস্তানের ইসলামী ব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে পরিচালিত যেকোনো ধরনের সশস্ত্র আন্দোলনকে, যে নাম বা পরিচয়েই তা পরিচালিত হোক না কেন, বিদ্রোহের অন্তর্ভুক্ত মনে করে এবং এর দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর পরিণতি রয়েছে।
ফিকহের দৃষ্টিতে বিদ্রোহের সংজ্ঞার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাউকে বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হওয়া প্রয়োজন। আহলুস সুন্নাহর ফকিহগণ বিদ্রোহীদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, তাদের সংখ্যা এমন হতে হবে যে, সেনাবাহিনী মোতায়েন ও যুদ্ধ করা ছাড়া তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, তারা শাসকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক কোনো এলাকায় সংঘবদ্ধ হবে।
তৃতীয়ত, তাদের মধ্যে এমন কোনো ভুল ধারণা বা সংশয় থাকতে হবে, যার কারণে তারা শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়েছে।
এই সংজ্ঞা আজ আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক নিয়ে ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা গোষ্ঠীগুলোর অবস্থার সঙ্গে স্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভিত্তিহীন দাবি ও সংশয়ের কারণে তারা নিজেদের সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং শাসককে ভুল মনে করে। কিন্তু বাস্তবে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা শরিয়াহ ও আইনগত কাঠামোকে পদদলিত করছে।
বিদ্রোহের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন সূরা আল-হুজুরাতের নবম আয়াতে সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার বিধান তুলে ধরেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
«وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِینَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَیْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِی تَبْغِی حَتَّی تَفِیءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ»
“মুমিনদের দুটি দল যদি পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর তাদের একদল যদি অপর দলের ওপর সীমালঙ্ঘন করে, তাহলে যে দল সীমালঙ্ঘন করছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।”
কুরআনের মহান মুফাসসিরগণ এই আয়াতে ‘বাগই’ শব্দের অর্থ করেছেন অন্যায়ভাবে জুলুম ও আগ্রাসন করা এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া। এই আয়াত শুধু বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিধানই বর্ণনা করে না, বরং বৈধ শাসকের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়াকেও সীমালঙ্ঘন ও বিদ্রোহ হিসেবে স্পষ্টভাবে বিবেচনা করে।
আজ ভিন্ন ভিন্ন নাম ও পতাকার অধীনে যারা আফগানিস্তানের ইসলামী ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করছে, তারা এই আয়াতের আওতাভুক্ত বিদ্রোহের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সরকারের ওপর অর্পিত একটি শরিয়াহসম্মত দায়িত্ব।
আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহও শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থানকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং এর ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণনা করেছে। নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত হয়েছে,
«مَنْ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا مَاتَ مِیتَةً جَاهِلِیَّةً»
“যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য থেকে এক বিঘত পরিমাণও বেরিয়ে যায়, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে।”
এই সতর্কবাণী থেকে বোঝা যায়, সংশয় কিংবা সংস্কারের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেও সশস্ত্র বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম নববি রহ. মনে করেন, শাসক জালিম হলেও সশস্ত্র বিদ্রোহ সাধারণত আরও বড় ধরনের ফিতনা ও অনিষ্টের জন্ম দেয়। আর মুসলমানদের রক্তের নিরাপত্তা বিদ্রোহের চেয়ে অধিক অগ্রাধিকার রাখে। আফগানিস্তানের বর্তমান ইসলামী ব্যবস্থার মৌলিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো যেহেতু শরিয়াহর নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই এর বিরুদ্ধে যেকোনো সশস্ত্র তৎপরতাকে নিঃসন্দেহে বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফকিহগণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিদ্রোহ ইসলামী ব্যবস্থার রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। এই অপরাধ নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য হলো ইসলামী সমাজের স্থিতিশীলতা ও অস্তিত্ব রক্ষা করা। এ কারণে ইসলামী সরকারের দায়িত্ব হলো, যারা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান পরিচালনা করে তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং এই ফিতনা নির্মূল করার জন্য বৈধ সব উপায় প্রয়োগ করা।
এই প্রবণতার ব্যাপারে নীরবতা কিংবা শিথিলতা শুধু শরিয়াহর দৃষ্টিতে ভুল নয়, বরং তা যুক্তি ও সামষ্টিক কল্যাণের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। বিদ্রোহ এমন এক ফিতনা, যা সূচনাতেই প্রতিহত করা না হলে সমাজকে রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং বিদেশি শত্রুদের হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ কেবল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়, বরং ইসলামী শাসকের ওপর অর্পিত একটি শরিয়াহসম্মত ও জাতীয় দায়িত্ব।





















