ইসলামী ব্যবস্থার অবশিষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
১০. ইসলামী ব্যবস্থা একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা
ইসলাম এমন এক দীন, যা কেবল ইবাদত ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার দিকনির্দেশনাই দেয় না; বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত জীবনের জন্যও একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত ব্যবস্থা প্রদান করে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায় (عدل)—আর এই বৈশিষ্ট্যই ইসলামকে অন্যান্য মানবপ্রণীত ব্যবস্থার তুলনায় স্বতন্ত্র ও মহিমান্বিত করে তোলে।
ন্যায়ের ধারণা ও সংজ্ঞা
উলামায়ে কিরাম ন্যায়ের বিষয়ে বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ উক্তি নিম্নে তুলে ধরা হলো—
১. আল্লামা ইবনু হাযম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
العدل هو: أن تعطي من نفسك الواجب، وتأخذه
অনুবাদ: ন্যায় হলো—তুমি অন্যদের প্রতি তোমার উপর যে ফরয দায়িত্ব রয়েছে তা আদায় করবে, আর তাদের কাছ থেকে তোমার যে ফরজ অধিকার রয়েছে তা গ্রহণ করবে।
২. আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
العدل: بذل الحقوق الواجبة، وتسوية المستحقين في حقوقهم
অনুবাদ: ন্যায় হলো—অপরের ফরয অধিকার আদায় করা, নিজের অধিকার গ্রহণ করা এবং অধিকারপ্রাপকদের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠা করা।
৩. আল্লামা জুরজানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
العدل: هو الأمر المتوسط بين طرفي الإفراط والتفريط
অনুবাদ: অতিরঞ্জন ও অবহেলার দুই প্রান্তের মাঝামাঝি অবস্থাই ন্যায়।
৪. শরিয়তের পরিভাষায় ন্যায়ের সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়েছে:
العدالة في الشريعة عبارة عن الاستقامة على طريق الحق بالاجتناب مما هو محظور دينا
অনুবাদ: শরিয়তের দৃষ্টিতে ন্যায় হলো—মানুষের সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকা।
সমাজে ন্যায়ের গুরুত্ব
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ
অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ন্যায় ও ইহসানের নির্দেশ দেন।
ন্যায় ইসলামের অন্যতম মহান ও সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য, যাকে ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছে। কুরআনে কারীমে ‘عدل’ ও ‘قسط’-এর বিভিন্ন রূপ প্রায় ২৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে—যা এ বিষয়ের গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
ন্যায়ের ধারণা মূলত দুটি মৌলিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত—
১. মানুষের পারস্পরিক অধিকারসমূহে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
২. প্রতিটি অধিকার ন্যায়সংগত ও সহজ পদ্ধতিতে আদায় করা।
ন্যায় আল্লাহ তাআলার অন্যতম গুণ; কারণ তাঁর প্রতিটি বাণী, কর্ম ও ফয়সালা পরিমিতি ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইসলামী সমাজে ন্যায়ের ভিত্তি
ন্যায় ইসলামী সমাজ ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি। যে সমাজে জুলুমের শাসন প্রতিষ্ঠিত, সেখানে পরিপূর্ণ ইসলাম বাস্তবায়িত হতে পারে না। এ কারণেই ইসলাম সামাজিক ন্যায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং দাবি করেছে—ইসলামী আইনের সামনে সকল মানুষ কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই সমান হবে।
ন্যায় শাসকের ব্যক্তিগত রুচি বা মনোভাবের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি শরিয়তের এক অপরিহার্য নীতি। প্রজাদের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা খলিফার জন্য অন্যতম গুরুদায়িত্ব। এ বিষয়ে সমগ্র উম্মাহ একমত—প্রত্যেক শাসকের ওপর ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ফরজ কর্তব্য।
ইসলামী সভ্যতার একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য
ন্যায় কেবল ব্যক্তিজীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মাণে এর ভূমিকা কেন্দ্রীয়। ইসলাম তার সমগ্র ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করেছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—ব্যক্তিগত জীবন হোক, পারস্পরিক সম্পর্ক হোক কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা—ন্যায় একটি অপরিহার্য ও মৌলিক নীতি।
নবী কারীম ﷺ, খুলাফায়ে রাশিদীন ও তাবেঈন (রহিমাহুমুল্লাহ)–এর যুগে ন্যায়ের উজ্জ্বল ও বাস্তব দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। এ কারণেই ইসলাম একটি প্রকৃত ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা—যা মানবতার সাফল্য, শান্তি ও উন্নতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান উপস্থাপন করে।



















