মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ ইবনু সালিম আল-কাহতানি
মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ ইবনু সালিম আল-কাহতানি তাঁর গ্রন্থ
“الولاء والبراء من مفاهيم عقيدة السلف”
প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৯-এ লিখেছেন, “গোয়েন্দাগিরি (تجسس) এক মহা বিশ্বাসঘাতকতা এবং কোনো মুসলিম এটি করলে তা কবিরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুতর পাপ। এটি কাফিরদের সঙ্গে এমন এক প্রকার বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত, যার বিধান কখনো ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া কুফর পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আবার কখনো কবিরা গুনাহের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে। যদি কোনো ব্যক্তি কাফিরদের বিজয়, মুসলিমদের উপর তাদের আধিপত্য ও শক্তি বৃদ্ধিকে ভালোবেসে, সেই উদ্দেশ্যেই গোয়েন্দাগিরি করে, তবে তা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া কুফর হবে। আর যদি তা কোনো ব্যক্তিগত, দুনিয়াবি স্বার্থ, পদ-মর্যাদা বা অনুরূপ কোনো উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবে তা হবে কবিরা গুনাহ।”
এরপর তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মুমতাহিনায় হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনার মাধ্যমে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা প্রদান করেছেন।”
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ﴾
ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ: যে মুসলিম অন্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করে, তা চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং ভয়াবহ কবিরা গুনাহ। এটি কাফিরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের এমন এক রূপ, যার কারণে কেউ কখনো কুফরে লিপ্ত হতে পারে, আবার কখনো কবিরা গুনাহে পতিত হয়।
যদি এই গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশ্য হয়—কাফিররা মুসলিমদের উপর বিজয়ী হোক, যুদ্ধ জিতুক, মুসলিমদের উপর তাদের প্রভাব ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পাক এবং এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বা দুনিয়াবি স্বার্থ না থাকে, তবে এমন ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ এ কাজটি তখন আকিদাগত বিকৃতি ও বিশ্বাসগত দুর্নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আর যদি গুপ্তচরবৃত্তি কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ, ব্যক্তিগত লাভ, সম্মান, ভীতি বা অনুরূপ কোনো কারণে হয়ে থাকে, তবে সে ব্যক্তি কাফির হবে না; বরং সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হবে, কিন্তু ইসলাম থেকে বের হবে না।
এরপর তিনি (পৃষ্ঠা ৩০৩-এ) লিখেছেন, “যদিও আয়াতে হাতিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাজকে এক প্রকার মুওয়ালাত (কাফিরদের প্রতি আনুগত্য) হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তা ভালোবাসার প্রকাশ ছিল, তবুও রাসূল ﷺ-এর বাণী ‘সে তোমাদের সত্য বলেছে, তাকে ছেড়ে দাও’—স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যদি কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানদার হয় এবং সন্দেহগ্রস্ত না হয়ে কেবল দুনিয়াবি উদ্দেশ্যে এমন কাজ করে, তবে সে কুফরে লিপ্ত হয় না।
আর যদি সে কাফির হতো, তবে ‘তাকে ছেড়ে দাও’ বলা হতো না। তবে কাফির গুপ্তচর হলে তাকে হত্যা করা হবে; কারণ নবী ﷺ মুশরিক গুপ্তচরকে হত্যা করেছেন।”
শায়খ আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল আযিয ইবনু হামাদাহ আল-জাবরিন
তিনি তাঁর গ্রন্থ
“تسهيل العقيدة الإسلامية”
প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৬৩-এ লিখেছেন:
একজন মুসলিমের কাফিরদের সহায়তা করা—যুদ্ধের মাধ্যমে হোক, অর্থ বা অস্ত্র দিয়ে হোক, মুসলমানদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে হোক বা অন্য যে কোনোভাবে হোক—এটি দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার
যেখানে কোনো দুনিয়াবি বা ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই; বরং কেবল কাফিরদের প্রতি ভালোবাসা এবং মুসলমানদের উপর তাদের বিজয় কামনা বিদ্যমান—এ ধরনের সহায়তা কুফর এবং ইসলাম থেকে বের করে দেয়। কারণ এটি আকিদাগত বিকৃতি ও বিশ্বাসগত দুর্নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে বহু আলেম ইজমা (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয় প্রকার
যেখানে কাফিরদের সহায়তা করা হয় কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভীতি, বা দুনিয়াবি শত্রুতার কারণে—এটি হারাম ও কবিরা গুনাহ, কিন্তু কুফর নয় এবং ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
এর প্রমাণ হলো, ইমাম তাহাবি রহিমাহুল্লাহ যে ইজমা বর্ণনা করেছেন, তা হলো: মুসলিম গুপ্তচরকে হত্যা করা বৈধ নয়। এর অর্থ সে মুরতাদ নয়।
এই ইজমার ভিত্তি হলো হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনা। তিনি মক্কা বিজয়ের সময় নবী ﷺ-এর গোপন অভিযানের সংবাদ মুশরিকদের কাছে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ। তবুও নবী ﷺ তাঁকে মুরতাদ ঘোষণা করেননি।
এই বিধান কেবল স্বেচ্ছায় করা কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জোরপূর্বক বাধ্য হলে, যেমন কাফিরদের সঙ্গে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হলে এই হুকুম প্রযোজ্য নয়। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿إِلَّا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً﴾
(সূরা আলে ইমরান: ২৮)
যেখানে কাফিরদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহযোগিতাকে মোটামুটিভাবে কুফর বলা হয়েছে, তা মূলত প্রথম প্রকারের সহযোগিতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যেখানে আকিদাগত বিকৃতি বিদ্যমান। আর দ্বিতীয় প্রকারে যেখানে সহযোগিতা কোনো দুনিয়াবি বা ব্যক্তিগত স্বার্থ, আত্মীয়তা বা শত্রুতার কারণে—তা হারাম ও কবিরা গুনাহ হলেও কুফর বা ইরতেদাদ নয়।
এ বিষয়ে সালাফ ও খালাফের অধিকাংশ আহলে সুন্নাত আলেমের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তাঁরা তাকফিরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়া কোনো সাধারণ বা অস্পষ্ট ফতোয়া প্রদান করেন না।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমার জন্য আবশ্যক হলো—বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও সুস্পষ্টতা অবলম্বন করা। কারণ ব্যাখ্যাহীন সাধারণীকরণ ও অস্পষ্টতা সব যুগেই চিন্তা ও বাস্তবতাকে বিপর্যস্ত করেছে।”
আরেকটি মৌলিক নীতি হলো, একজন মুসলিম নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধির চেয়ে সালাফে সালিহিনের উপলব্ধিকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ তাঁদের ফহমই সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও বাস্তবের নিকটবর্তী।
এর বিপরীতে, বিভ্রান্ত ফিরকা যেমন খারিজি, মুতাযিলা প্রমুখ সালাফের ফহমকে মানদণ্ড না বানিয়ে নিজেদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেয়, যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পথ নয়।





















