পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে ‘লোকদেখানো কূটনীতি’র নেপথ্যের বাস্তবতা
লেখক: আহমদ শাফাক
আজকের পাকিস্তানের অর্থনীতির দিকে তাকালে মনে হবে, মরুভূমির মাঝখানে তৃষ্ণার্ত এক ব্যক্তি মরীচিকার পেছনে ছুটে চলেছে। দেশটি তার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সরকারের প্রধান চিন্তা এখন আর অর্থনীতি পুনর্গঠন করা নয়; বরং পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ খুঁজে বের করা। এই মরিয়া পরিস্থিতিতে নিজেদের ভাসিয়ে রাখার আশায় পাকিস্তান একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও রিয়াদের দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ার পরই তাকে আরেকটি তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার অর্থনীতি কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর আওতায় ইসলামাবাদ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে বিলম্বিত পরিশোধের কারণে জমে থাকা ১৭২ বিলিয়ন রুপির সারচার্জ ও জরিমানা মওকুফের আবেদন জানিয়েছিল। দুই দেশের বহুল প্রচারিত ‘সর্বকালীন বন্ধুত্ব’ এই বোঝা কিছুটা লাঘব করবে, এমনটাই আশা করেছিল পাকিস্তান সরকার। কিন্তু বেইজিং সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো অবশ্যই সম্মান করতে হবে। বিষয়টি সেখানেই শেষ।
এই প্রত্যাখ্যান পাকিস্তানের জন্য আরেকটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কোম্পানিগুলোর কাছে পাকিস্তানের বকেয়া এখন ৪২৩ বিলিয়ন রুপিরও বেশি হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত এই বোঝা সাধারণ পাকিস্তানিদের ঘাড়েই এসে পড়বে আরও বেশি বিদ্যুৎ বিলের আকারে।
চীনকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে ইসলামাবাদ অতীতের মতোই আবার রিয়াদের দিকে ফিরেছে। তবে এবার তাদের আবেদনটি ব্যতিক্রমী। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এর ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান অত্যন্ত সহজ শর্তে ৬.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি Oil Financing Facility বা তেল অর্থায়ন সুবিধা চেয়েছে সৌদি আরবের কাছে। এই আবেদন পরিস্থিতি কতটা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে, তারই স্পষ্ট প্রকাশ।
আগের বছরগুলোতে বিলম্বিত পরিশোধের ব্যবস্থায় তেল নেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পরিশোধ করত। এবার তারা মাত্র প্রতীকী ১ শতাংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি তারা ১৫ বছরের পরিশোধকাল চেয়েছে, যার প্রথম পাঁচ বছরে কোনো কিস্তিই দিতে হবে না। এ ধরনের ব্যবস্থা ইসলামাবাদকে কয়েক বছরের জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু এই আবেদন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রকাশ করে: পাকিস্তান নিজেই মনে করছে, অন্তত আগামী ১৫ বছর আমদানি করা তেলের মূল্য সরাসরি পরিশোধ করার মতো সক্ষমতা তার থাকবে না।
এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের জনগণের ধৈর্য ও ক্রয়ক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এরপর রয়েছে ওয়াশিংটন। পাকিস্তান মার্কিন ট্রেজারির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ আর্থিক সুবিধা চেয়েছে। তবে এই আবেদনের পেছনের গল্প কোনো অর্থনৈতিক অলৌকিকতার নয়; বরং ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দাবার বোর্ডে চলমান এক রাজনৈতিক খেলার।
ইসলামাবাদের দাবি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সময় পাকিস্তান নীরবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেছে। এখন তারা আশা করছে, সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবে ১০ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে, যা আইএমএফের কঠোর শর্তের কারণে সৃষ্ট কিছু চাপ লাঘব করতে তাদের সাহায্য করবে।
ওয়াশিংটন থেকে কিছু আশাব্যঞ্জক সংকেতও এসেছে। কিন্তু সামগ্রিক চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত দিকের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত রয়েছে; বরং তা উন্নতির পরিবর্তে আরও খারাপ হয়েছে। এ কারণেই পাকিস্তানের আবেদন এখনো কাগজপত্রের পর্যায় অতিক্রম করতে পারেনি এবং বাস্তবে রূপ নেওয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে পুরো পরিস্থিতি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি তাতে এক ধরনের নির্মম পরিহাসও রয়েছে।
যে রাষ্ট্র বিদেশি ঋণ, জরুরি সহায়তা এবং বারবার ঋণ-সুবিধা পাওয়ার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে, সে কীভাবে বিশ্বের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে নিজেকে কার্যকর ও প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে?
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো স্থায়ী বন্ধুত্বের কারণে সম্পর্ক বজায় রাখে না। তারা তা করে নিজেদের প্রভাব হারাতে না চাওয়ার কারণে। ওয়াশিংটন জানে, পাকিস্তানকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করলে দেশটি সম্পূর্ণভাবে চীনের অর্থনৈতিক বলয়ে চলে যেতে পারে। গোয়াদরের মতো কৌশলগত বন্দরগুলো তখন আমেরিকান স্বার্থের জন্য তাদের গুরুত্ব হারাবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশে তার কথিত ভূমিকা নিশ্চিত করে যে, প্রতিটি বড় শক্তির হিসাবেই পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এ কারণেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলো পাকিস্তানকে এতটা দুর্বল হতে দেয় না যে দেশটি ভেঙে পড়ে; আবার এমন শক্তিশালীও হতে দেয় না, যাতে সে পুরোপুরি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। এখানে স্থায়ী কোনো বন্ধুত্ব নেই; আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। কোনো দেশ কেবল পাকিস্তান একটি ইসলামী রাষ্ট্র বলে, কিংবা তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের কারণে তাকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে যাবে, এমনটা কখনোই হবে না।
যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তান তার রপ্তানি বৃদ্ধি না করবে, করব্যবস্থায় সংস্কার না আনবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামরিক কাঠামো ও রাজনৈতিক মহলে দুর্নীতির মোকাবিলা না করবে এবং উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী না করবে, ততদিন পর্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে সে আরেকটি ঘুঁটি হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকবে।
ঋণের টাকায় কেনা তেল এবং লোকদেখানো কূটনীতি হয়তো কিছু সময়ের জন্য দেশের বাতি জ্বালিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু এগুলো কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।





















