ভিক্ষাবৃত্তি ও নিত্যনতুন নাটকবাজি!

লিখেছেন: সালামত আলী খান

প্রতিটি জনপদেই একজন না একজন এমন নীচ প্রতিবেশী থাকে, যে দারিদ্রের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করেও অকারণ অহংকারে ফুলে-ফেঁপে থাকে। ঋণ নেয়, অথচ উপকারকারীদের দিকেই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। যেদিকেই তাকানো হয়, দেখা যায় তার কলহ-বিবাদ ছড়িয়ে থাকে; কিন্তু নিজের ভুল সে কখনোই স্বীকার করে না। কখনো যদি পাড়া-মহল্লার কোনো প্রবীণ ব্যক্তি স্নেহের সঙ্গে তার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে একে একে তার ভুলগুলো বোঝান এবং সমাধানের উপদেশ দেন, তখন সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে ইবনে উবাইয়ের অনুসারীদের সেই ঐতিহাসিক বাক্যই আওড়ায়—“আমরা তো বড়ই সংস্কারক।”

সে নিজেই দেয়াল-সংলগ্ন সৎ প্রতিবেশীকে উত্ত্যক্ত করে বয়কটে বাধ্য করে। এরপর যখন তার নিজের সন্তানরা সেই প্রতিবেশীর ঘরে যাওয়ার এবং কিছু চাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে, নিজেদের করুণ অবস্থা দেখিয়ে তারই নির্বুদ্ধিতার ফলাফল সামনে আনে, তখন ওই ভদ্রলোক মসজিদে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিতে থাকে যে, “আমরা তো অত্যন্ত মানবদরদি মানুষ। জানি, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ছিল; কিন্তু তাদের সন্তানের খাতিরে আমরা তা পুনঃস্থাপন করছি।” যেন অভাবগ্রস্ত সে নিজে নয়, বরং প্রতিবেশীই! অথচ বাস্তবতা এই যে, এই নীচ ব্যক্তি নিত্যনতুন নাটক দেখিয়ে আসল কাজ—ভিক্ষা ও অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ—সাধনের জন্যই হাত-পা ছুড়ে মারছে।

ভেবে দেখলে বোঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবীর বুকে কুফরী বিশ্বের ক্ষেত্রে ইসরায়েল এবং ইসলামী বিশ্বের ভেতরে পাকিস্তান ঠিক সেই নীচ প্রতিবেশীর ভূমিকাই পালন করছে। চারজন প্রতিবেশীর সঙ্গে তার সম্পর্ক। ভারতের সঙ্গে তো শুরু থেকেই হাতাহাতি। আর নিজের ভ্রান্ত নীতির দরুন জনসংখ্যাগতভাবে নিজের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ বাংলাদেশকে ভারতের কবলে সঁপে দিয়ে এসেছে; সঙ্গে এক লক্ষ সৈন্যকেও জীবিত অবস্থায় হস্তান্তর করেছে। দ্বিতীয় প্রতিবেশী ইরান, সত্তরের অধিক বছরেও নিজের স্বার্থে তো নয়ই, জনগণের কল্যাণেও তার কাছ থেকে কখনো কোনো উপকার নেয়নি, বরং কেবল অকল্যাণই টেনেছে এবং অকল্যাণই ছড়িয়েছে। তৃতীয় প্রতিবেশী চীন, যার দুর্বলতা হলো পশ্চিমে পৌঁছানোর সরাসরি কোনো পথ না থাকা। এই দুর্বলতাকে কেন্দ্র করেই তথাকথিত ভাইয়েরা দীর্ঘদিন লুটপাট চালিয়েছে। বিশ বছর ধরে তার এই বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিয়ে সবকিছু আদায় করেছে, অথচ তার জন্য একটি কাজও করেনি। তাই সেই প্রতিবেশীও মাঝে মাঝে তার অনিষ্ট ও প্রতারণা থেকে বাঁচতে সরলভাবে আফগানিস্তান বা ইরানকে বেছে নেওয়ার, কিংবা বিকল্প কোনো পথ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। চতুর্থ প্রতিবেশী আফগানিস্তান, এ কথা সত্য যে আফগান শরণার্থীদের নামে সে সারা বিশ্ব থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং তাদের আশ্রয়ও দিয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, এই শরণার্থীদের এমন কঠিন সব পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করেছে, যা তারা পরকাল পর্যন্ত কবরেও ভুলতে পারবে না। যেসব শিবিরে তাদের রাখা হয়েছিল, সেখানে তারা মানবাধিকারের সবকিছু থেকেই বঞ্চিত ছিল। বিদ্যুৎ ও গ্যাস তো দূরের কথা, পানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনও ছিল অপ্রাপ্য। তা সত্ত্বেও শরণার্থীদের কথা বাদ দিলেও, আফগানিস্তানের ভেতরে যেখানে যতটুকু পারা গেছে, সর্বত্রই অনুপ্রবেশ চালানো হয়েছে। এই শরণার্থীদের ঢাল বানিয়ে আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ভদ্র প্রতিবেশীর আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করে নানাবিধ দাবি আদায় করা হয়েছে।

এরপর আল্লাহ তাআলা যখন চল্লিশ বছরের কঠিন ও ধৈর্যনির্ভর সংগ্রামের পর আফগানিস্তানকে তার প্রকৃত সন্তানদের মাধ্যমে যোগ্য উত্তরাধিকার দান করলেন, তারা মাতৃসম দেশের জন্য ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে স্বাধীনতা দিলেন এবং শরয়ি নীতিমালা ও সুদৃঢ় দীনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলামী ইমারাত, তখন এই নীচের পেটে মোচড় দিতে শুরু করল। সে যেকোনো উপায়ে তাকে জ্বালাতনের ফন্দি আঁটতে লাগল। অবশেষে তাকে নবীন ও দুর্বল ভেবে সুযোগসন্ধানী আক্রমণ চালিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দিল। কিন্তু যুদ্ধে তার প্রত্যাশার বিপরীতে ভদ্র প্রতিবেশী ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিল—এবার এই নীচামির জবাব দেওয়া জরুরি। ফলে যুদ্ধও হলো, এবং এমন শিক্ষা দেওয়া হলো যে, আঞ্চলিক পর্যায়ে তাকে একাধিক শক্তিশালী প্রতিবেশীর কাছে আর্তনাদ জানাতে হলো। তারা কঠিন পরিস্থিতি দেখে ভদ্র প্রতিবেশীর কাছে অনুরোধ করল—চলুন, আমরা এই জট খুলে দিই। কিন্তু নীচ তো নীচই, বাইরে কথা ছড়িয়ে দিয়ে আবার নাটক দেখাতে লাগল যে, “আমরা তো বাধা দিইনি, অমুক-তমুক বলেছিল বলেই আমরা রাজি হয়েছি।”

তুরস্ক ও কাতারের প্রচেষ্টায় এতটুকু হলো যে, আফগানিস্তানের সম্মানী ও হৃদয়গ্রাহী শাসকেরা যুদ্ধ থেকে হাত গুটিয়ে নিলেন। মানবিকতার দাবি ছিল যখন আফগানিস্তান আগ্রাসনসহ সব ধরনের নীচামি সহ্যই করে ফেলেছে, তখন আস্থা তৈরির জন্য অপর পক্ষ থেকেও কিছু সদিচ্ছামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতো। কিন্তু নিজের প্রকৃত স্বভাব অনুযায়ী সে নতুন কুটিলতা আঁটল। যেহেতু তখন আফগানিস্তানে আঙুর ও ডালিমের মৌসুম, তাজা ফল দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে—তাই সীমান্ত বন্ধ রেখে বাণিজ্য-নিষেধের আড়ালে প্রতিবেশীর অসহায়তার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা হলো। দরজা বন্ধই রইল। না আল্লাহর ভয়, না ব্যবসায়ী ও কৃষকদের বছরের পরিশ্রমের কোনো মূল্য, না মানবাধিকারের কোনো স্মরণ। কিন্তু এবার আফগানিস্তানের সম্মানিত ও মর্যাদাবান জনগণ এই বিশ্বাসে যে রিযিকদাতা একমাত্র আল্লাহ—এবং এই নীচামির মাধ্যমে যেহেতু আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে, ঘোষণা দেয়া হলো, “দরজা বন্ধই আছে, এবং আমাদের দিক থেকে আরও বেশি বন্ধ বলেই ধরে নিন। এবার খুললে শর্ত আমাদের হবে।” এটি কি কেবল ঘোষণা ছিল? না! এ ছিল বাধ্যবাধকতার সুযোগ নেওয়াদের ভূখণ্ডে মুখোমুখি বিস্ফোরিত এক পরমাণু বোমা।

আফগানিস্তান ধৈর্যের সঙ্গে বিকল্প পথের সন্ধান শুরু করল। দৃশ্যমান ক্ষতিও বড় ছিল, কিন্তু নির্ভরতার যে মানসিকতা ছিল, তা প্রকৃত অর্থেই ভেঙে দেওয়া হলো। অপরদিকে, যেহেতু সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শক্তিগুলো জনগণকে সেখানকার এক মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, কুকুরসম আচরণের যোগ্য মনে করে, তাই জনগণের ক্ষতি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। না কোনো কার্যকর বিকল্প পথ খোঁজা হলো, না কোনো সন্তোষজনক জবাব দেওয়া হলো। ফলে জনগণ ক্রমেই ক্ষতি দেখতে দেখতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনরা বুঝে গেল—এবার জনগণ পিছু নিলে পরিস্থিতি এমন হবে যে, কেউই আর সামাল দিতে পারবে না। তখন আবার বিশ্বের সামনে ভিক্ষার ঝুলি মেলে ধরা হলো। একে একে সবার পায়ে ধরল—কখনো রাশিয়া, কখনো ইরান, কখনো সৌদি আরব ও কাতার, কখনো তুরস্ক, এমনকি জাতিসংঘের দরজাও কড়া নাড়ল। কিন্তু ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পে সুসজ্জিত ইসলামী ইমারাত কারও কথার কোনো জবাবই দিল না। তখন আপনজনেরা তাদের পরিবারের এক সম্মানিত ব্যক্তি ইসহাক দারের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিল এবং তা পড়তে বলল। ইসহাক দার একজন সম্মানিত মানুষ; কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তিনি সেনাবাহিনীর হাতে জিম্মি। তিনি কাগজ পড়ে বলছিলেন, জাতিসংঘ নাকি আমাদের অনুরোধ করেছে মানবাধিকারের ভিত্তিতে দরজা খুলে দিতে। স্পষ্টতই এটি তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া একটি কৌতুক। আমাদের অনুমান—সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে এটি পড়তে গিয়ে তিনি লজ্জায় ঘামে ভিজে যাচ্ছিলেন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শক্তিগুলোর ব্যাপারে এক রাজনীতিকের উক্তির মতো ভাবছিলেন, এরা ভিক্ষাও চায়, আবার গুণ্ডামিও করে। অভিযুক্তও এরা, আবার এরাই মানবাধিকারের বক্তৃতা দেয়। মানবতাকে নিজেরাই হত্যা করেছে, অথচ মানবাধিকারের পতাকাবাহীও সেজেছে। তিনি হয়তো ভাবছিলেন—আমরা কোন আধুনিক যুগে বাস করছি! ভিক্ষার জন্য কত নিত্যনতুন নাটক আবিষ্কৃত হচ্ছে!

আমরা এই অনুমান করছি কেন? কারণ মানবাধিকার তখনই ছিল, যদি সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা রাজনীতিকে বাণিজ্যের ঊর্ধ্বে না তুলে স্বাভাবিক নিয়মে আঙুর ও ডালিম রপ্তানির অনুমতি দিত। কিন্তু তাজা ফল তাদের চোখের সামনেই পচে নষ্ট হচ্ছিল, আর তারা নির্বিকার ছিল। অথচ এখন, যখন নিজেদের জনগণের চাপ বেড়েছে, মাল্টার মৌসুম এসেছে, আলুর বস্তা নালায় স্তূপ হচ্ছে, তখন মানবতা মনে পড়েছে! বাহ, কী মানবিকতা! এটি কেমন মানবতা? অন্যের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে দেওয়া, আর নিজের পালা এলে বুক ফুলিয়ে স্বার্থ চাওয়া? এরপর জাতিসংঘের দোহাই দিয়ে কী নির্লজ্জভাবে উপকারের কথা জাহির করা হচ্ছে! আমার তো একেবারেই সেই নীচ প্রতিবেশীর কথাই মনে পড়ে। তবে একটি বিষয় তারা দৃষ্টির আড়ালে রেখেছে—হ্যাঁ, তাদের নীচামি প্রবলভাবে প্রকাশ পায়, কিন্তু সাহসী মানুষ যখন নিজেদের ভদ্র আচরণের সীমা অতিক্রম করে, তখন তারা নীচদের নীচামির ওপর সিল না মেরে আর নিজেদের ভদ্রতার পোশাক পরিধান করে না। সুতরাং এই নাটক ও ভিক্ষার নিত্যনতুন কৌশল বিশ্ব দেখছে, আর তারা কিছুই করতে পারছে না, কারণ এবার ভদ্র প্রতিবেশী সত্যিই কিছু করে দেখিয়েছে।

Exit mobile version