১৫ ফেব্রুয়ারি: স্বাধীনতার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উপাখ্যান!

✍🏻 ​ত্বালহা মুবারেয

১৫ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত লাল ফৌজের প্রস্থানের ৩৭তম বার্ষিকী। এই দিনটি আফগান মুসলিম জাতির অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ, বীরত্ব এবং সাহসিকতার এক জীবন্ত স্মারক হিসেবে বিবেচিত হয়।

২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৯ তারিখে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অহঙ্কারী লাল ফৌজ তাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তি নিয়ে মযলুম আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়। তারা এই ভূখণ্ডের মানুষের ঈমান ও ইসলামী মূল্যবোধ মুছে দিতে চেয়েছিল এবং আফগানিস্তানে একটি সেক্যুলার ও নাস্তিক্যবাদী ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এই ব্যর্থ ও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় তারা ১০ লক্ষাধিক আফগানকে শহীদ, জখম, বন্দি ও পঙ্গু করেছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষকে হিজরত করতে বাধ্য করেছে।

যদিও বিভ্রান্ত মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ দখলদারদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আফগানিস্তানের সমগ্র শরিফ ও মুমিন জাতি “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে, শূন্য হাতে এবং ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। আবারও জিহাদ ও স্বাধীনতার ডাক ভেসে এলো; মানুষ পাহাড় ও গ্রাম থেকে জেগে উঠল, ঐক্যবদ্ধ হলো এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক শক্তিতে পরিণত হলো যা প্রাসাদে বসে থাকা জালিমদের তাসের ঘর গুঁড়িয়ে দিল। আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে তারা আবরাহার বাহিনীর মতো সেই আক্রমণকারী বাহিনীকে এমন পরাজয় উপহার দিল, যা ইতিহাসের পাতায় এক মহান শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে জাতি অনেক ক্ষত ও কষ্ট সহ্য করেছে—এমন সব ব্যথা যা আজও অনেক ঘরে জীবন্ত। যেখানে সেই সময়ের নিখোঁজ হওয়া বাবা ও ছেলেদের আজও কোনো হদিস নেই এবং তাদের জীবন বা শাহাদাত সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। যখন বিভিন্ন প্রদেশে গণকবর আবিষ্কৃত হলো, তখন সেই বছরের অপরাধগুলো আবার নতুন করে সামনে এলো এবং স্বজনরা তাদের হারানো প্রিয়জনদের চিনতে পারল।

যখন এই ভূখণ্ডের জাতি আল্লাহ তায়ালার ওপর দৃঢ় তাওয়াক্কুল (ভরসা) করল, তখন দশ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তক্ষয়ী যুলুম ও অপরাধ সত্ত্বেও, যার স্মৃতি আজও অনেক মুরুব্বীদের মনে সতেজ—এই জাতি কখনোই জালিম ও অপরাধী বাহিনীর সামনে মাথা নত করেনি। বরং নিজেদের রক্তের বিনিময়ে তারা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। তারা আক্রমণকারী বাহিনীকে এমন দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল যে, তারা এই জাতির সামনে আর টিকে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে এই ভূখণ্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হয়; অথচ তাদের হাজার হাজার সৈন্য নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছিল। এই পরাজয় অন্যান্য পরাশক্তিদের জন্যও এক ঐতিহাসিক শিক্ষা ও সতর্কবার্তা হয়ে রইল, যাতে তারা আফগানিস্তান দখলের চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৫ ফেব্রুয়ারি হলো মর্যাদা, গর্ব এবং জাতীয় গৌরবের দিন। এই দিনটি সেই জাতির সাহসিকতার সাক্ষ্য দেয় যারা ঈমান, দৃঢ়তা এবং ক্লান্তিহীন সংকল্পের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই লিখেছে। এই পথের শহীদদের স্মৃতি ইতিহাসের হৃদয়ে উজ্জ্বল প্রদীপের মতো চিরকাল জ্বলতে থাকবে এবং এই স্বাধীন জাতির আত্মত্যাগ ও বীরত্ব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে অম্লান থাকবে, ঠিক যেমনটি আমরা প্রতি বছর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে এই দিনটি উদযাপন করি। সেই মুজাহিদদের সন্তান ও নাতি-পুতিরা, যারা সোভিয়েত লাল ফৌজের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে কুরবানি দিয়েছিলেন, আজ তাদের পূর্বসূরিদের এই ঐতিহাসিক বিজয়ে গর্বিত।

Exit mobile version