প্রায় এক শতাব্দীর নিরলস সংগ্রামের পর ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে এই প্রাচীন ভূমি আফগানিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে নিজের স্থান করে নেওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ১০৭ বছর।
১২৯৮ হিজরি শামসির ২৮ আসাদ এ জাতির পঞ্জিকার নিছক একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই স্বাধীনতার স্মৃতি, যা এ দেশের মানুষের শিরায় শিরায় প্রবাহিত এবং প্রতি বছর এই দিনটি ফিরে এলে নতুন করে জাগ্রত হয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো জাতির সম্মান ও মর্যাদা কোনো মূল্যের বিনিময়েই কেনা যায় না। আর স্বাধীনতার যদি কোনো মূল্য থেকে থাকে, তবে এ ভূখণ্ডের মানুষ আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থতার মাধ্যমে সেই মূল্য পরিশোধ করেছে।
আফগানিস্তানের ইতিহাস কখনোই শান্ত ও নিরুপদ্রব ছিল না। এর ভৌগোলিক অবস্থান বারবার একে বৃহৎ শক্তিগুলোর নজরের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। অন্যদিকে এর দুর্গম ও দুর্বার ভূপ্রকৃতি এবং জনগণের সাহস ও স্বাধীনতাপ্রিয়তা তাদের বিদেশি আধিপত্য ও অপমানের সামনে মাথা নত করতে দেয়নি। একাধিকবার বিশাল বিশাল সেনাবাহিনী এ দেশে প্রবেশ করেছে এবং পেছনে রেখে গেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি। কিন্তু প্রতিটি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের বীর সন্তানেরা পাহাড়ের মতো অটল থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত আক্রমণকারীদের বিপর্যস্ত ও হতাশ অবস্থায় পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
২৮ আসাদ সেই দীর্ঘ সংগ্রাম ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধেরই ফসল। এটি সেইসব নির্ণায়ক যুদ্ধের স্মারক, যার প্রতিটি বিশ্বকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে, আফগানিস্তানকে কখনো সহজে বিদেশি শাসনের অধীন করা যায় না।
ব্রিটিশদের সঙ্গে আফগানিস্তানের প্রথম সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৩৯ সালে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা লোভাতুর দৃষ্টিতে আফগান ভূমির দিকে তাকিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের সাহায্যে তারা সহজেই এই দেশ দখল করতে পারবে। কিন্তু আফগানিস্তানে এসে তারা কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়নি; বরং তারা সম্মুখীন হয়েছিল একটি সমগ্র জাতির প্রতিরোধের ঝড়ের, এমন এক জাতির, যার প্রতিটি মানুষ নিজের মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায় যেন একটি করে দুর্গে পরিণত হয়েছিল।
আমির দোস্ত মুহাম্মদ খান এই মহান প্রতিরোধের নেতৃত্বে ছিলেন। সাহস ও কৌশলের মাধ্যমে তিনি আফগানিস্তানের দুর্গম ও প্রায় দুর্ভেদ্য পাহাড়ের মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তাদের ওপর ব্যাপক আঘাত হানতে সক্ষম হন। যুদ্ধের পর ব্রিটেনকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছিল, তা শুধু যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ নয়; বরং এর পেছনে থাকা সেই প্রতিরোধের চেতনা, যে চেতনা আফগানের শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত সবার মধ্যে সমানভাবে জীবন্ত ছিল এবং তাদের যেকোনো শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দিয়েছিল।
১৮৭৮ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় যুদ্ধ। প্রথম যুদ্ধে পরাজয়ের কথা ব্রিটিশরা ভুলে যায়নি। এবার তারা আরও সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নিয়ে এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। কিন্তু তারা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল: অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে এই জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আমির আবদুর রহমান খান বিভিন্ন গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং জাতীয় চেতনা ও জনগণের সাহসকে কাজে লাগান। আবারও ঔপনিবেশিকদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং ব্রিটিশদের পিছু হটা ছাড়া আর কোনো পথ রইল না।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৯ সালের মে মাসে। এ সময় আফগানিস্তানের স্বাধীনতার সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। বাদশাহ আমানুল্লাহ খান জনগণের ঈমান ও দৃঢ়সংকল্প থেকে শক্তি সঞ্চয় করে জিহাদের পতাকা উত্তোলন করেন।
আফগান যোদ্ধারা ঈমান ও সাহস নিয়ে ব্রিটিশদের কামান ও মেশিনগানের সামনে দাঁড়িয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাহিনীর ওপর এমন কঠোর আঘাত হানে যে দুই হাজারেরও বেশি ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়। এ যুদ্ধে ব্রিটেনের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড বলে ধারণা করা হয়।
অবশেষে সেই বছরের ২৮ আসাদ আফগানিস্তানের আকাশে স্বাধীনতার ঘোষণা ধ্বনিত হয় এবং বাদশাহ আমানুল্লাহ খান দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ততদিনে ব্রিটিশরা বুঝে গিয়েছিল তারা কেমন একটি জাতির মুখোমুখি হয়েছে। ফলে রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে তারা আফগানিস্তানের স্বাধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের অর্থ এই ছিল না যে সব সংকটের অবসান ঘটেছে। ব্রিটেন এত সহজে এ অঞ্চলে তার স্বার্থ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা আফগানিস্তানের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
আবারও এই কঠিন পরিস্থিতির ভার বহন করতে হয় আফগান জনগণকে। স্বাধীনতার জন্য যে স্বাধীনতা তারা লড়াই করে অর্জন করেছিল, তা বিসর্জন দেওয়ার পরিবর্তে তারা ক্ষুধা ও অসংখ্য দুর্ভোগ সহ্য করেছে। নিজেদের সরকারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই অমূল্য স্বাধীনতা রক্ষায় অবিচল থেকেছে। এই চেতনা প্রমাণ করেছে—আফগান জনগণ নিজেদের অস্তিত্ব ও সম্মানের জন্য যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত, কিন্তু নিজেদের স্বাধীনতা কখনো বিসর্জন দেবে না।
আজ আমরা যখন এই মহান ঐতিহাসিক বিজয়ের ১০৭তম বার্ষিকী পালন করছি, তখন আরও গভীর ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিতে স্বাধীনতার অর্থ অনুধাবন করা আমাদের কর্তব্য।
স্বাধীনতা কেবল একটি ঐতিহাসিক পরিচয় নয়; এটি একটি চলমান দায়িত্ব, যা বর্তমান প্রজন্মের কাঁধে গুরুতর কর্তব্য অর্পণ করে। আমরা সেই শহীদদের উত্তরসূরি, যাদের রক্ত ও আত্মত্যাগ আমাদের হাতে এই অমূল্য উত্তরাধিকার তুলে দিয়েছে। জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা, এ দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা এবং সামাজিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এই আমানত সংরক্ষণ করাই আমাদের দায়িত্ব।
অতএব, স্বাধীনতা শুধু এমন কোনো দিন নয়, যা বছরে একবার স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতা একটি স্থায়ী দায়িত্ব। এটি আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, ঐক্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয় এবং পুনর্গঠন, অগ্রগতি ও জাতীয় মর্যাদার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা হয়।





















