দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ এমন এক সহিংস সংঘাতের মুখোমুখি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নীতিনির্ধারিত নিরাপত্তা কৌশল। এই সংঘাতের অগ্নিশিখা আজও শান্তির সম্ভাবনাকে গ্রাস করে চলেছে, যার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ পশতুন জনগণকে, এমনকি রাষ্ট্রকেও।
সমসাময়িক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল প্রশ্ন হলো, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত, আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবিদার এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পেশাদার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীগুলোর সহায়তাপুষ্ট একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী কেন মাত্র কয়েক হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার একটি নেটওয়ার্ককে পরাজিত করতে দৃশ্যত অক্ষম বলে প্রতীয়মান হয়?
এই নিরাপত্তাগত অচলাবস্থা উপলব্ধি করতে হলে কেবল বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করলেই চলবে না। প্রয়োজন পাকিস্তানের অতীত কৌশলগত সিদ্ধান্ত, ভৌগোলিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের ইতিহাস পর্যালোচনা করা। এখানে সামরিক শক্তির প্রচলিত তুলনামূলক হিসাব-নিকাশ তার ব্যাখ্যাগত সক্ষমতার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে।
একদিকে রয়েছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, যার পেশোয়ারভিত্তিক একাদশ কোরের (XI Corps) অধীনে তেরোটি স্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে যার সদস্যসংখ্যা ফ্রন্টিয়ার কোরের সহায়তায় প্রায় দেড় লক্ষে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং হাফিজ গুল বাহাদুর গোষ্ঠীর সক্রিয় যোদ্ধাদের সম্মিলিত সংখ্যা ছয় থেকে সাত হাজারের মধ্যে। পাকিস্তানের নবগঠিত প্রক্সি বাহিনী আইএসআইএসকেও যদি এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে সংখ্যা প্রায় আট হাজারে পৌঁছে। এখানে আইএসআইএসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী প্রকাশ্যে নিজেকে এ গোষ্ঠীর বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে কাগজে-কলমে শক্তির ভারসাম্য সামরিক বাহিনীর পক্ষে প্রায় বিশ-এক অনুপাতে অবস্থান করছে।
তবুও সামরিক বিজ্ঞানের একটি পরিচিত নীতি, যা “টুথ-টু-টেইল রেশিও” নামে পরিচিত, আমাদের বলে যে কোনো সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশই রসদ ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং সামরিক স্থাপনা সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েও খাইবার পাখতুনখোয়ায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে নিরাপত্তা সংকটের সমাধান এখনো কেন সম্ভব হলো না?
অনেক সামরিক বিশ্লেষক গেরিলা যুদ্ধের জটিলতাকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পক্ষে একটি ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে এই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আশির দশকে এই একই পাকিস্তানি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছিল যে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদীনদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিক্ষা দিচ্ছে। এখানেই সামরিক ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বিদেশি ভূখণ্ডে একটি প্রক্সি যুদ্ধ পরিচালনা এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহবিরোধী অভিযান পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দক্ষতা দাবি করে।
বিদেশি সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতির ভার পড়ে অন্যের ভূখণ্ডের ওপর। কিন্তু নিজ দেশে ভারী অস্ত্র ও বিমানশক্তির অসতর্ক ব্যবহার অনিবার্যভাবেই বেসামরিক প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি স্থানীয় জনগণকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বয়ানকে শক্তিশালী করার জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে।
যখন একটি রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক কর্তৃত্বের ওপর অনড় থাকে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের দাবি থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন এক ধরনের অচলাবস্থার জন্ম হয়। এমন পরিস্থিতিতে যে পক্ষই বিজয়ের দাবি করুক না কেন, সাধারণ মানুষ অবশ্যম্ভাবীভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের চিন্তাধারা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের শিকড় মূলত ১১ সেপ্টেম্বর-পরবর্তী সেই কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিহিত, যেগুলো পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের সামনের সারিতে ঠেলে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে পরিচালিত ব্যাপক সামরিক অভিযানগুলো হয়তো সাময়িকভাবে কিছু জঙ্গি ঘাঁটি ও আশ্রয়স্থল ধ্বংস করেছিল, কিন্তু এর মূল্য দিতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ স্থানীয় মানুষকে। হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। চেকপোস্ট ও নিরাপত্তা বিধিনিষেধ জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার মানসিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি করেছে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে জনঅসন্তোষ ও হতাশার ভার।
পশতুন তাহাফ্ফুজ মুভমেন্ট (পিটিএম)-এর মতো আঞ্চলিক আন্দোলনের উত্থানকেও এই জনঅসন্তোষ, অবিশ্বাস এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা উচিত। সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের চেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্র ২০১৮ সালে সাবেক ফেডারেলি অ্যাডমিনিস্টার্ড ট্রাইবাল এরিয়াস (ফাটা)-কে খাইবার পাখতুনখোয়ার সঙ্গে একীভূতকরণকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ফ্রন্টিয়ার ক্রাইমস রেগুলেশন (এফসিআর)-এর মতো ঔপনিবেশিক যুগের আইন থেকে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের প্রতি উপজাতীয় জনগণের আনুগত্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বীকৃত ও প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবুও একীভূতকরণের পর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন তহবিল বাস্তবে কার্যকর হয়নি; অন্যদিকে দুর্বল বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক অবহেলা এক বিপজ্জনক প্রশাসনিক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, একটি সেনাবাহিনী হয়তো সাময়িকভাবে কোনো অঞ্চলকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে মুক্ত করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব কেবল শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, কার্যকর প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে। আলোচনার অগ্রগতির পথে প্রকৃত বাধা নিহিত রয়েছে উভয় পক্ষের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও চাপের মধ্যে। রাষ্ট্র এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয়তা দেখাতে অনিচ্ছুক, যারা তার সংবিধানকে প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের প্রতি গভীরমূল অবিশ্বাস তাদের চিন্তায় দৃঢ়ভাবে প্রোথিত থাকায় বিদ্রোহীরাও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ মেনে নিতে রাজি নয়।
অনেক যোদ্ধার স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত রয়েছে ১৯৫৯ সালে বেলুচ নেতা নবাব নওরোজ খানের ঘটনাটি, যখন পবিত্র কুরআনের ওপর প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয়েছিল এবং তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আস্থাভঙ্গের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে যে, আন্তর্জাতিক বা রাজনৈতিক নিশ্চয়তা ছাড়া পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করা আত্মবিনাশেরই শামিল।
এই কারণেই সংঘাতটি এখন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে। রাষ্ট্রের কাছে বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে, আর বিদ্রোহীদের কাছে রয়েছে এমন গেরিলা নেটওয়ার্ক, যা তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।
বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, স্থায়ী শান্তি কখনো কেবল বন্দুকের নল থেকে জন্ম নেয় না; বরং তা অর্জিত হয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পারস্পরিক উপলব্ধি এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কত্বের মাধ্যমে।
পাকিস্তান যদি সত্যিই শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে চায়, তবে তাকে শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পিছু ধাওয়া করলেই চলবে না। তাকে সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলোকেও মোকাবিলা করতে হবে, যা শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের হতাশ করে এবং সংঘাতের পথে ঠেলে দেয়।
অগ্রসর হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো, রাষ্ট্র তার অনমনীয় অবস্থানে নমনীয়তা প্রদর্শন করবে, স্থানীয় উপজাতীয় জিরগা এবং তৃণমূল রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে নিয়ে আসবে, এবং এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা প্রদান করবে, যা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একটি বৈধ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশে উৎসাহিত করবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির অন্তর্নিহিত কৌশলগত স্ববিরোধিতা যতদিন না দূর হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী যতদিন না অর্থনৈতিক অধিকার ও দ্রুত বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাবে, ততদিন পাকিস্তানে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার স্বপ্ন কেবল স্বপ্নই হয়ে থাকবে।





















