বর্তমান বিশ্বে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক যুদ্ধ সশস্ত্র সংঘাতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব যুদ্ধ রণাঙ্গনে নয়; বরং মানুষের চিন্তা, আবেগ ও দৃঢ়তার ময়দানে সংঘটিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর প্রভাব সামরিক অভিযানের চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এমন এক সংঘাতের ধরন, যেখানে কোনো অস্ত্রের গুলি ছোড়া হয় না; অথচ এর প্রভাব অনেক সময় প্রচলিত যুদ্ধের চেয়েও গভীরে পৌঁছে যায়। এটি মানুষের মন, আবেগ, ভয়, আশা ও সংকল্পকে লক্ষ্য করে। এর মধ্যে থাকে অত্যন্ত পরিকল্পিত এমন সব প্রচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য শত্রুসেনা, কমান্ডার, সাধারণ বেসামরিক মানুষ, এমনকি নিজেদের সমর্থকদেরও প্রভাবিত করা এবং তাদের মনোবল দৃঢ় করা। এর লক্ষ্য হলো ব্যয়বহুল যুদ্ধে না গিয়েই শত্রুকে আত্মসমর্পণ, পশ্চাদপসরণ অথবা নিজের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। শ্বেত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সত্য তথ্যের ওপর নির্ভর করে; তবে সেগুলোকে অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়। কৃষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও শত্রু সম্পর্কে বানানো গল্পের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধূসর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায় এবং চলমান ঘটনাবলি সম্পর্কে অর্ধসত্য উপস্থাপন করে। এর পদ্ধতিও অসংখ্য। মানুষকে ঘুম থেকে বঞ্চিত করার জন্য উচ্চ শব্দ, তীব্র আলো ও সংগীত ব্যবহার করা হয়। মিথ্যা সংবাদ ও বানানো ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বন্দিদের এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যাতে তারা প্রচারণার কাজে লাগতে পারে। ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়। এ ছাড়াও রয়েছে আরও বহু কৌশল।
মানুষের মন সবচেয়ে বেশি দুর্বল ও স্পর্শকাতর। একবার মনোবল ভেঙে গেলে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও ধসে পড়তে শুরু করে। যে সৈনিক মনে করে, ‘আমরা তো আগেই হেরে গেছি’, সে বাস্তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই পরাজিত হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে প্রতিটি দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বহু রাষ্ট্রের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনাকারী বিশেষ ইউনিট রয়েছে, যারা দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।
প্রচারণামূলক যুদ্ধ: আরেকটি রণাঙ্গন
এটি সত্যকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক যুদ্ধ। কার ঘটনাবিবরণী শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হবে? কে বিশ্বকে বিশ্বাস করাতে পারবে—‘আমরাই সঠিক, তারাই ভুল’? এই ধরনের যুদ্ধ তথ্য ও সুচিন্তিত বয়ান বা ন্যারেটিভের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করে। এটি এক পক্ষের প্রতি সমর্থন তৈরি করে এবং অন্য পক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। প্রচারণা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
প্রচারণা হলো গণমাধ্যম, শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করার সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে প্রভাবিত করা। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মতো প্রচারণারও শ্বেত, কৃষ্ণ ও ধূসর—এই তিন রূপ রয়েছে। শ্বেত প্রচারণা নিজেদের পক্ষের সাফল্য ও অর্জনকে তুলে ধরে। কৃষ্ণ প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানানো ছবি, ভুয়া ভিডিও, জাল অডিও রেকর্ড এবং অন্যান্য মিথ্যা উপকরণের ওপর নির্ভর করে। ধূসর প্রচারণা সত্য তথ্যের সঙ্গে মনগড়া দাবিকে মিশিয়ে উপস্থাপন করে।
আধুনিক প্রচারণার সরঞ্জামগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এখন সীমিত সম্পদসম্পন্ন গোষ্ঠীগুলোও এগুলো ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালাতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও ও অডিও, জনপ্রিয় অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার, মিম, কার্টুন, স্কুল এবং এমনকি ইতিহাসের পাঠ্যবইও প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
প্রচারণা এত শক্তিশালী কেন? কারণ মানুষ গল্পের প্রতি সাড়া দেয়। কেউ যদি বিশ্বাসযোগ্য একটি গল্প বলে নিজেদের দাবি করে ‘আমরাই নির্যাতিত’, অথবা ‘আমরাই বীর’—তাহলে অনেক মানুষ তা বিশ্বাস করে এবং তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। অনেক সময় সত্যটা কী, তার চেয়ে গল্পটি কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
এসব সরঞ্জাম যত সহজলভ্য হয়েছে, তাদের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও তত বহুগুণ বেড়েছে। এগুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও অবিশ্বাস ছড়াতে পারে। এত বিপুল পরিমাণ মিথ্যা ছড়িয়ে দিতে পারে যে মানুষ শেষ পর্যন্ত সত্যকেই চিনতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তরুণদের উগ্রপন্থী চিন্তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর প্রভাব প্রবীণ, তরুণ এমনকি শিশুদের ওপরও পড়ে। প্রচারণামূলক যুদ্ধ সশস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পরেও চলতে থাকে। যে পক্ষ প্রচারণার যুদ্ধে বিজয়ী হয়, সে অনেক অন্যান্য ক্ষেত্রেও সুবিধা অর্জন করে।
পাকিস্তানের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক যুদ্ধ
পাকিস্তানের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক অভিযান প্রধানত ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস ডিরেক্টরেট (ISPR) এবং ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় বয়ান বা ন্যারেটিভ গঠন করে, বিশেষত ভারত, কাশ্মীর ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি নিয়ে।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ISPR পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সরকারি গণমাধ্যম শাখা হিসেবে কাজ করে। সামরিক বিবৃতি, ভিডিও, সংবাদ সম্মেলন, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সংবাদপত্র এবং ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এটি জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য হলো সামরিক বাহিনীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা; প্রতিপক্ষ, সাধারণত ভারত এবং সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানকে আগ্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা এবং অভ্যন্তরীণ সমালোচনা কমিয়ে আনা। বট, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পরিচালিত প্রচারণাও এ প্রচেষ্টার নিয়মিত অংশ। আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করার জন্য পাকিস্তানি সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার এবং প্রবাসী পাকিস্তানিদেরও ব্যবহার করা হয়।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহু দশক ধরে জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ। ইসলামাবাদ, বিশেষত তার সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো, দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বজায় রাখার জন্য প্রচারণা ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযান ব্যবহার করে আসছে। এসব প্রচেষ্টা তাদের তথাকথিত ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ নীতির অংশ। এর লক্ষ্য হলো কাবুলে এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ অথবা নির্ভরশীল সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যা একই সঙ্গে ভারতের প্রভাব মোকাবিলা করবে। এই প্রচারণার বড় একটি অংশ মিথ্যা সংবাদ, মনগড়া বয়ান, ধর্মীয় ও জাতিগত আবেগের অপব্যবহার এবং শত্রুতা ছড়ানোর ওপর নির্ভরশীল।
২০২১ সালের পর পাকিস্তান ও ইসলামী ইমারাত আফগানিস্তান (IEA)-এর সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। শুরুতে ইসলামাবাদের নতুন সরকারের সঙ্গে তেমন সমস্যা ছিল না। কিন্তু পরে তারা আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-কে সমর্থন করার অভিযোগ তুলতে শুরু করে। অন্যদিকে আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইন সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান বজায় রাখে।
পাকিস্তানের দাবি, তালেবানের সহযোগিতায় আফগান ভূখণ্ড থেকে TTP-এর যোদ্ধারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অভিযোগই প্রচারণা ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার ইসলামাবাদের ব্যর্থ প্রচেষ্টার ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
ISPR নিয়মিত আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহযোগিতা, ডুরান্ড লাইন নিরাপদ রাখতে ব্যর্থতা এবং TTP-এর মুজাহিদিনদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রায় প্রতিটি হামলার পরই তারা দ্রুত বিবৃতি দিয়ে দাবি করে যে অভিযানটি আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিকল্পিত হয়েছে এবং এর জন্য IEA দায়ী। এসব দাবির উদ্দেশ্য হলো দেশের অভ্যন্তরে মনোবল শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা।
২০২১ সালের পর থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরেও বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নানগারহার, পাকতিকা, কুনার ও খোস্তে পরিচালিত হামলাও রয়েছে। এসব অভিযানকে পাকিস্তানি তালেবান ও আইএস-খোরাসানের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাকিস্তানি প্রচারণায় এগুলোকে আত্মরক্ষা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখানো হয়। বাস্তবে এগুলো কাবুল পাকিস্তানের দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করার পর সামরিক শাসকগোষ্ঠীর হতাশা প্রকাশেরই বহিঃপ্রকাশ; আর সেই হতাশা বারবার বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানি গণমাধ্যম এসব অভিযানকে সামরিক বিজয় হিসেবে প্রচার করে; অথচ এগুলো সামরিক শাসকগোষ্ঠীর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ছাড়া আর কিছু নয়। আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের পাশাপাশি তারা ব্যাপক ডিজিটাল প্রচারণাও চালায়। বট নেটওয়ার্ক, সমন্বিত হ্যাশট্যাগ এবং বানানো গল্প ব্যবহার করে IEA-কে এমন একটি অযোগ্য প্রশাসন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যারা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়।
TTP-এর প্রতিটি হামলার পরই দ্রুত এমন প্রচারণা শুরু হয় যে আফগানিস্তান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং IEA তার প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য সম্ভাব্য সব উপায় ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করাও রয়েছে, যদিও প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল অন্যত্র।
পাকিস্তান জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামও ব্যবহার করে IEA-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে। অথচ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই IEA ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না এবং এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য তারা কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছে।
পাকিস্তানের এই অভিযান একই সময়ে একাধিক ময়দানে পরিচালিত হচ্ছে। সীমান্তপারের হামলার মাধ্যমে সামরিক শক্তি প্রয়োগ, অভিযোগ ও মনোবল ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং গণমাধ্যম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রচারণা—সবকিছুই এর অংশ। ইসলামাবাদ আশা করছে, এর মাধ্যমে IEA-কে TTP-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু সবার কাছেই স্পষ্ট যে TTP পাকিস্তানের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে, সেখানেই প্রশিক্ষিত হয়েছে এবং এখনো সেখানেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের একগুঁয়ে নীতিই দুই দেশের সম্পর্ককে প্রকাশ্য সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দাঈশ কীভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক যুদ্ধ ব্যবহার করে
দায়েশ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম কার্যকর ও নৃশংস প্রচারণা-যন্ত্র গড়ে তুলেছিল। তাদের দ্রুত বিস্তারের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক অভিযান ও প্রচারণার বড় ভূমিকা ছিল। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে তারা হাজার হাজার তরুণকে দলে টেনেছে, শত্রুদের ভীত করেছে এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে। তাদের প্রচারণা কখনোই নিছক তথ্য পরিবেশন ছিল না; এটি নিজেই ছিল একটি অস্ত্র। সংগঠনটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনীয় অত্যন্ত উন্নতমানের ভিডিও তৈরি করত, যার মধ্যে Flames of War-এর মতো প্রযোজনাও ছিল। তারা জিহাদি সংগীত, অ্যানিমেশন, মিম, ইনফোগ্রাফিক এবং বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষায় বিভিন্ন প্রচারসামগ্রী প্রকাশ করত।
তারা নিজেদের যোদ্ধাদের বীর ও চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উপস্থাপন করত এবং শত্রুদের কাফির ও মুরতাদ হিসেবে চিহ্নিত করত। ভয় সৃষ্টি করার জন্য শিরশ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড ও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে দিত। মুসলিম বিশ্বের মানুষের আকর্ষণ তৈরি করতে তারা খিলাফতের পবিত্র ধারণাকে ব্যবহার করেছিল। তারা ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং যাকে তারা ‘প্রকৃত জিহাদের ময়দান’ বলত—তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করত।
দায়েশ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল অসাধারণভাবে বুঝেছিল। প্যারিস ও ব্রাসেলসের মতো শহরে হামলাগুলো তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এমন বার্তা দেওয়ার জন্য উপস্থাপন করত: ‘আমরা সর্বত্র আছি। আপনি কখনোই নিরাপদ নন।’
বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে বসবাসকারী তরুণদের তারা ‘বীর’ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্যের একটি অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা করত। তাদের বার্তা ছিল: ‘আপনিও একজন বীর হতে পারেন।’ এই আবেদন অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল এবং বহু মানুষকে ইউরোপজুড়ে হামলা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল।
আধুনিক প্রচারণার সরঞ্জামগুলো সহজলভ্য হয়ে উঠলে দাঈশও এগুলোর ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, এক্স এবং আরও কয়েক ডজন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা কয়েক লাখ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করত। অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করত, যাতে আরও কার্যকরভাবে প্রচারণা ছড়ানো যায়।
তাদের গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক শুধু ভিডিও ও অডিও সম্প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা পেশাদারভাবে ডিজাইন করা ম্যাগাজিন ও বই প্রকাশ করত। অন্যদিকে আমাক নিউজ এজেন্সি (Amaq News Agency) একাধিক ভাষায় দ্রুত সংবাদ আপডেট প্রকাশ করত। এমনকি তারা প্রচারণার সবচেয়ে পুরোনো কিন্তু এখনো কার্যকর একটি মাধ্যম FM রেডিও স্টেশন পরিচালনাও ব্যবহার করেছিল।
দায়েশের সাফল্যের পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, খিলাফত ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্লোগানের অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দক্ষ মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। প্রকৌশলী, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ সংগঠনটির মধ্যে নিজেদের স্থান খুঁজে পেয়েছিল। প্রত্যেককে তার দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া হতো।
দ্বিতীয় কারণ ছিল গতি। কোনো ঘটনা ঘটার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দায়েশ সংবাদ ও প্রচারণামূলক উপকরণ প্রকাশ করত। তারা মানুষকে দলে ভেড়ানোর কৌশল অন্য অনেক সংগঠনের চেয়ে ভালোভাবে বুঝত এবং কীভাবে শ্রোতা ও দর্শকদের প্রভাবিত করে সেই প্রভাবকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়, তাও তারা জানত।
যদিও দায়েশের ভূখণ্ডভিত্তিক খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এ অঞ্চলে তাদের বাস্তব উপস্থিতিও অনেকাংশে বিলীন হয়েছে, তাদের অনলাইন খিলাফত এখনো সক্রিয় রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, দাঈশ প্রচারণা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে সামরিক শক্তির চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। তারা বুঝেছিল, একবার মানুষের মন জয় করা গেলে ভূখণ্ড দখল অনেক সময় তার পরেই আসে। পরবর্তীতে আরও অনেক জিহাদি সংগঠন একই পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণামূলক যুদ্ধ মূলত সত্যকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক যুদ্ধ। যে পক্ষ শক্তিশালী গল্প বলতে পারে এবং মানুষের মন জয় করতে পারে, অন্যান্য বহু ক্ষেত্রেও সে পক্ষ সুবিধা অর্জন করে। এসব সংঘাতে সাফল্যের জন্য শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিও। বর্তমান সময়ে তথ্যও যেকোনো বন্দুকের মতোই বিপজ্জনক একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।





















