নৌবাহিনী শক্তিশালী করার উদ্যোগ
সুলতান যেসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল উসমানি নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি নৌবাহিনী গড়ে তোলা, যা কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। কারণ কনস্টান্টিনোপলের মতো সমুদ্রনির্ভর একটি শহরকে শক্তিশালী নৌবাহিনী ছাড়া অবরোধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
বলা হয়, এই উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা জাহাজের সংখ্যা একসময় প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছিল।
বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি
কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের আগে সুলতান মুহাম্মদ তাঁর কয়েকজন শত্রুর সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অন্য দিকগুলো নিয়ে নিশ্চিন্ত থেকে একমাত্র কনস্টান্টিনোপলের বিরুদ্ধেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া।
এ ছাড়া কনস্টান্টিনোপলের প্রতিবেশী গালাতা আমিরাতের সঙ্গেও তিনি সন্ধি করেন। এটি কনস্টান্টিনোপলের পূর্বদিকে অবস্থিত ছিল এবং গোল্ডেন হর্নের জলরাশি থেকে শহরটিকে পৃথক করে রেখেছিল।
একইভাবে কনস্টান্টিনোপলের আশপাশে অবস্থিত হাঙ্গেরি ও ভেনিসের রাজ্যগুলোর সঙ্গেও চুক্তি করা হয়েছিল। তবে কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ শুরু হলে এসব চুক্তি আর টেকেনি। অন্যান্য খ্রিস্টান দেশের সৈন্যদের পাশাপাশি এসব আমিরাত ও রাজ্যের সৈন্যরাও শেষ পর্যন্ত কনস্টান্টিনোপলের প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়।
এদিকে সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ যখন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের দিন গুনছিলেন এবং দিনরাত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন বাইজেন্টাইন সম্রাট অবরোধ ঠেকানোর জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চালাতে থাকেন।
তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমঝোতার হাত বাড়িয়ে দেন। সুলতানকে তাঁর লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সুলতান মুহাম্মদ কোনো প্রস্তাবেই সাড়া দেননি।
তিনি সংকল্প করেছিলেন, যেকোনো মূল্যে কনস্টান্টিনোপল জয় করবেন এবং উসমানি সাম্রাজ্যের সামনে থাকা এই শেষ বড় বাধাটিও দূর করবেন।
যখন বাইজেন্টাইন সম্রাট বুঝতে পারলেন যে উসমানি বাহিনী অর্থের বিনিময়ে পিছু হটবে না এবং সুলতান শহরটি বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাছে সাহায্য চাওয়া শুরু করলেন।
বিশেষ করে তিনি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় নেতা রোমের পোপের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন।
কনস্টান্টিনোপল ছিল পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের প্রধান কেন্দ্র। ক্যাথলিকদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বিরোধও ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যকে বাঁচানোর তাগিদে বাইজেন্টাইন সম্রাট সেই বিরোধকে একপাশে সরিয়ে রাখলেন এবং রোমের পোপের সহযোগিতা চাইলেন।
বাইজেন্টাইন সম্রাট একপ্রকার বাধ্য হয়েই পোপের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নিলেন এবং তাঁকে নিজের মিত্র করার চেষ্টা করলেন। এমনকি তিনি ঘোষণা করলেন, পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স চার্চের খ্রিস্টানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি পোপের আনুগত্য মেনে নিতেও প্রস্তুত।
অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কাছে বিষয়টি মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের গভীর বিরোধ ছিল। তবু সম্রাট নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
একপর্যায়ে পোপ তাঁর একজন প্রতিনিধিকে কনস্টান্টিনোপলে পাঠালেন। সেই প্রতিনিধি শহরের সবচেয়ে বড় গির্জা হায়া সোফিয়ায় বক্তব্য দেন এবং পোপের জন্য প্রার্থনাও করেন।
এই ঘোষণার কথা শুনে অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের অনেকেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা সম্রাট ও পোপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছিল, “বাইজেন্টাইন ঘরবাড়িতে লাতিনদের পোশাক দেখার চেয়ে আমরা বরং তুর্কিদের পাগড়ি দেখতেই বেশি পছন্দ করব।”
কনস্টান্টিনোপল এমন এক ভৌগোলিক অবস্থানে ছিল, যা তাকে স্বাভাবিকভাবেই একটি শক্তিশালী দুর্গে পরিণত করেছিল। শহরটি বসফরাস প্রণালি, মারমারা সাগর এবং গোল্ডেন হর্নের জলপথ দ্বারা ঘেরা ছিল।
শহরের নিরাপত্তার জন্য সমুদ্রপথে শত্রু জাহাজের প্রবেশ ঠেকাতে বিশাল শৃঙ্খল ও প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ব্যবহার করা হতো। প্রয়োজন হলে শৃঙ্খল কিছুটা ঢিলে করে জাহাজকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতো। আবার বিপদের সময় সেটি টেনে শক্ত করে পথ বন্ধ করে দেওয়া হতো।
শহরের স্থলভাগের প্রতিরক্ষাতেও ছিল শক্তিশালী ব্যবস্থা। দ্বীপের দিক থেকে মারমারা সাগর পর্যন্ত এবং সেখান থেকে গোল্ডেন হর্ন পর্যন্ত বিস্তৃত দুটি বড় দুর্গপ্রাচীর ছিল। দুটি দুর্গ একই প্রতিরক্ষা রেখার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি সেখানে ‘লাইকোস’ নামে একটি নদীও প্রবাহিত ছিল।
সব মিলিয়ে কনস্টান্টিনোপল ছিল এমন একটি সুরক্ষিত নগরী, যার প্রতিরক্ষা ভেদ করে প্রবেশ করা যেকোনো সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।





















