আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের তিক্ত শিক্ষাগুলোর একটি হলো, কিছু রাষ্ট্র ও গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে “বিভক্ত করো, শাসন করো” (Divide and Rule) নীতি অনুসরণ করে এসেছে। এই নীতির উদ্দেশ্য হলো সমাজের স্বাভাবিক সংহতিকে দুর্বল করা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা এবং তাদের অভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার শক্তিকে ভেঙে দেওয়া।
অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় বাহিনীর ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অন্যতম বিতর্কিত বিষয়। একইভাবে, বেলুচিস্তান ও পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতিও দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী, অনানুষ্ঠানিক মিলিশিয়া, সাবেক আরবাকাই এবং পরিকল্পিতভাবে জাতিগত উত্তেজনা উসকে দেওয়াকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন ও অবিশ্বাস গভীর করার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশের এলাকায় নতুন নিরাপত্তা হুমকি দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বেলুচিস্তানের বিভিন্ন শিবিরে আফগানিস্তানের সাবেক প্রজাতন্ত্রের কিছু সাবেক আরবাকাই ও সামরিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে তাদের পশতুন ও বেলুচ জনগণের বিরুদ্ধে প্রক্সি বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এই নিয়ন্ত্রণহীন ও আইনবহির্ভূত সশস্ত্র ব্যক্তিরা নিজেদের দেশে নিপীড়ন ও নির্যাতন ছাড়া তেমন কিছু শেখেনি। তাদের কিছু সামরিক দক্ষতা দেওয়া হলেও মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে তারা বেলুচিস্তানে সামরিক শাসনের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া, অপহরণ, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যা এবং নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে তারা শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। এই ভাড়াটে বাহিনীর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পশতুন ও বেলুচ জনগণ।
বেলুচ ও পশতুন জনগণ অভিন্ন ইতিহাস, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদার। তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ব আরও সুদৃঢ় করা শুধু এই দুই জাতির ভবিষ্যতের জন্যই নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। সাবেক আরবাকাইদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বেলুচ ও পশতুন উভয়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর একটি পরিকল্পিত, সুপরিকল্পিত ও বিপজ্জনক নীতি। এর উদ্দেশ্য শতাব্দীপ্রাচীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ধ্বংস করা এবং এই দুই জাতিকে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে দেওয়া।
একই সময়ে পাকিস্তানি সামরিক শাসনব্যবস্থা তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় এসব সাবেক আরবাকাইকে বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীল পরিবেশে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। তাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এসব ব্যক্তির অতীতের ব্যর্থ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তাদের অনানুষ্ঠানিক ও বেআইনি মিলিশিয়া হিসেবে ব্যবহার করছে। এই ভাড়াটে বাহিনীর মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে পশতুন ও বেলুচ জনগণের মধ্যে শত্রুতা ও সংঘাত সৃষ্টি করতে চায়।
বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন পাকিস্তানের জন্য এখনো একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। সামরিক শাসনব্যবস্থা প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে সেই আন্দোলন দমন করতে চায় এবং একই সঙ্গে বেলুচদের মনোযোগ পাকিস্তানের পরিবর্তে পশতুনদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দিতে চায়।
পশতুনদের বিরুদ্ধেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশে বসবাসকারী পশতুন জনগণ এবং তাদের জাতীয় দাবিকে দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে আসছে। তাই সামরিক শাসনব্যবস্থা তাদের বেলুচদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে তাদের মৌলিক দাবিগুলো থেকে বিচ্যুত করতে চায়। একই সঙ্গে পশতুন ও বেলুচদের মধ্যে সংঘর্ষ উসকে দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে সরিয়ে নিতে এবং নিজেদেরকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।
এই সামরিক শাসনব্যবস্থা-সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় পশতুন ও বেলুচ জনগণের উচিত ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানো। তাদের উপলব্ধি করতে হবে, যেসব আরবাকাইকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা প্রকৃত শত্রু নয়; তারা কেবল সামরিক শাসনের হাতিয়ার। তাদের উচিত নিজেদের পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা ও প্রবীণদের প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করা এবং কীভাবে তার মোকাবিলা করতে হবে তা জানা।
পশতুন ও বেলুচ জনগণের তরুণ প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে, তাদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হতে হবে এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রজ্ঞাকে সংরক্ষণ করতে হবে। তাদের কলম ও কণ্ঠের মাধ্যমে জনগণকে এই ভাড়াটে বাহিনীর বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। বর্তমান যুগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনসচেতনতা গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর অন্যতম। তাই তাদের উচিত সংবাদপত্র, গণমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই ষড়যন্ত্র উন্মোচন করা এবং এসব সাবেক আরবাকাইয়ের কর্মকাণ্ড, তাদের প্রশিক্ষণ শিবিরের অবস্থান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা।





















