পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। জনঅসন্তোষ, দমন-পীড়ন এবং দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ কেবল পাঞ্জাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার নীতিই এই সংকটের প্রধান কারণ। বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট দল ও পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে পরিণত হওয়া সামরিক শাসকগোষ্ঠী অন্যান্য প্রদেশ ও সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখে। তাদের নির্লজ্জতার চূড়ান্ত প্রকাশ হলো, তারা প্রকাশ্যেই বিশ্বের এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর চোখে ধুলো দিয়ে নিজেদের সন্ত্রাসবাদের শিকার, মানবাধিকারের রক্ষক এবং সমতার প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে।
পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই অবস্থানের বিরোধিতা করায় বর্তমানে কারাগারে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। তার সমর্থকদের পাশাপাশি দলনিরপেক্ষ অসংখ্য পাকিস্তানি স্বাধীনতা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক শাসকদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। অন্যায় ও অসৎ পথে কোনো বোঝা তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। জনগণকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না। সামরিক শাসকগোষ্ঠীকে সব সংখ্যালঘুর ন্যায্য অধিকার স্বীকার করতে হবে এবং নিজেকে সন্ত্রাসবাদের শিকার হিসেবে চতুরতার সঙ্গে উপস্থাপন করতে করতে গোটা অঞ্চল ও বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসব বিক্ষোভ ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে এবং এগুলোকে একটি প্রকৃত গণআন্দোলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বিপুল ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই গণআন্দোলন নিয়ে এতটাই আতঙ্কিত যে, ইসলামাবাদে প্রবেশের প্রায় সব সড়ক কনটেইনার ও কাঁটাতার দিয়ে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এর অর্থ কী? এর মধ্য দিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়। সামরিক শাসকগোষ্ঠী জনগণের মধ্যে আর অবস্থান বা গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারছে না। তারা আর পাকিস্তানের মুসলিম জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করতে পারে না। বরং তারা এমন একটি বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যারা আমেরিকা ও পশ্চিমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এবং যার লাভের অংশ যায় সেনাবাহিনীর জেনারেল ও নওয়াজ শরিফের দলের সদস্যদের হাতে।
চলমান এই বিক্ষোভের আরেকটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেতে পারে। প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, তারা নিজেরাই বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বোমা হামলা অথবা ড্রোন হামলা চালিয়ে এর দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপাতে পারে। এর মাধ্যমে তারা একই সঙ্গে দুটি উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। প্রথমত, বিশ্বকে দেখানো যে পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতার উৎস আফগানিস্তান। দ্বিতীয়ত, নিজেদের জনগণের মধ্যে এমন প্রচারণা চালানো যে আফগানিস্তান সরকার কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানের জনগণ ও বিক্ষোভকারীদের শত্রু।
পাকিস্তানের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পৃক্ত গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজের কর্মী এবং আন্দোলনের আয়োজকদের এই বিষয়টির প্রতি অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সামরিক শাসকগোষ্ঠীর এই কুৎসিত ও গোপন কর্মকৌশলের সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। কারণ একটি প্রকৃত গণআন্দোলন ও বিক্ষোভ দমন করতে শেষ মুহূর্তে এ ধরনের কৌশলই ব্যবহার করা হতে পারে। অতীতের ঘটনাবলি বারবার দেখিয়েছে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাজানো ঘটনা তৈরি করে এবং বিশ্বের সামনে নিজেদের একটি ইতিবাচক চেহারা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তারা যথেষ্ট অভ্যস্ত।
বিক্ষোভকারীরা জানেন, পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী কখনোই আফগান জাতির প্রতি সদয় আচরণ করেনি। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তারা নির্মম বোমাবর্ষণ চালিয়ে আসছে, নারী ও শিশুদের হত্যা করছে এবং মানবতা কিংবা প্রতিবেশীসুলভ আচরণের নামে কোনো নীতিরই তোয়াক্কা করছে না।
এ কারণেই এমন কোনো ঘটনা ঘটলে আফগান সরকার ও জনগণের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। বরং তারা এসব মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম ও সাফল্যের সমর্থক থাকবে। তবে এমন পরিস্থিতি এটিও ইঙ্গিত করবে যে, সামরিক শাসকগোষ্ঠী তাদের দ্বিমুখী নীতি, পরাধীনতা এবং পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষার রাজনীতির শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতারণা ও বিশ্বের চোখে ধুলো দিয়ে তারা আর নিজেদের সামরিক অস্তিত্ব এবং দলীয় কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস, জনগণের সমর্থনও আর তাদের সঙ্গে নেই। সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তারা এমন একটি কর্তৃত্ববাদী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করছে, যার ভিত্তি জনগণের আস্থা নয়, বরং ক্ষমতা ও দমন-পীড়ন।





















