আঞ্চলিক রাজনীতিকে অনেক সময় সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে নয়, বরং ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করেও বোঝা যায়। প্রথমে একটি বিস্ফোরণ, এরপর অভিযোগ, তারপর বিমান হামলা এবং সবশেষে অপর পক্ষের ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের দাবি। প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখলে এগুলো সাধারণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সময়, লক্ষ্যবস্তু এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক পরিবেশের সঙ্গে এগুলোকে মিলিয়ে দেখলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনীতির আরও বিস্তৃত একটি চিত্র সামনে আসে।
২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কোহাটে নিরাপত্তা স্থাপনাগুলোতে একটি রক্তক্ষয়ী হামলা হয়। এতে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। এর তিন দিন পর, ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান আফগানিস্তানের কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তানের দাবি ছিল, তারা সশস্ত্র ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে আফগান পক্ষ বেসামরিক হতাহতের কথা জানায় এবং জাতিসংঘও কুনারে বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর ডেরা ইসমাইল খানে আরও একটি রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে ১২ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু এই নয় যে, এসব হামলা কারা চালিয়েছে। বরং হামলার পর রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে কারা লাভবান হয়েছে, কেন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো এত দ্রুত আফগানিস্তানের দিকে নির্দেশিত হয় এবং এই নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য এসব প্রশ্নের উপস্থিতি নিজেরাই হামলার পরিকল্পনাকারী কারা ছিল, তার প্রমাণ নয়। তবে ঘটনাগুলো কীভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিশ্লেষণের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করে।
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যার একটি অংশের সঙ্গে আফগানিস্তানকে যুক্ত করে আসছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, কাবুল পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র ব্যক্তিদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে ইসলামী ইমারতে আফগানিস্তান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কোহাট হামলার পরও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মূলত আফগানিস্তানকেই কেন্দ্র করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং কয়েক দিন পর আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছেন। এ কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানে সংঘটিত প্রতিটি বড় হামলাকে কি আফগানিস্তানের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ, সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রাজনৈতিক সমর্থন বলয় তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ পাকিস্তান একই সময়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে একটি ‘বহিরাগত নিরাপত্তা হুমকি’ সামনে নিয়ে আসা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং নিরাপত্তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তানের আধুনিক ইতিহাসে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা কাঠামোর ব্যাপক ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, বিস্তৃত নিরাপত্তাব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে সংঘটিত বড় হামলার পর যখন সেগুলোর দায় আফগানিস্তানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন ওই কাঠামোর ভূমিকা, স্বার্থ এবং ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে এসব প্রশ্নের সত্যতা প্রমাণের জন্য স্বাধীন তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ৩১ আগস্ট সেটি বাস্তবায়নের জন্য কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সংঘটিত বড় কোনো ঘটনাকে দেশটির নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে আলোচনার বাইরে রেখে দেখা যায় না। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যৌথ সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট তার বৈদেশিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে পারে।
একই সময়ে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার প্রচেষ্টাও অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণে নতুন পরিবর্তন আনছে। সৌদি আরব, মধ্য এশিয়া, চীন, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে খনিজ, জ্বালানি, ট্রানজিট ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সম্পর্ক সম্প্রসারিত হলে একক কোনো অর্থনৈতিক পথের ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌদি আরবের ডেল্টা কোম্পানির আফগানিস্তানের তেল ও গ্যাস খাত নিয়ে দেওয়া প্রস্তাব, হেরাতের কুশক ও তিরপুল এলাকায় অনুসন্ধান প্রকল্প এবং হেরাত থেকে স্পিন বোলদাক পর্যন্ত সম্ভাব্য গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে মূল্যায়নও এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য।
আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ততা তাত্ত্বিকভাবে আফগানিস্তানের ওপর বহু বছর ধরে পাকিস্তানের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও ট্রানজিট প্রভাবকে সীমিত করতে পারে। এ কারণে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা, অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার চিত্র তুলে ধরা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করার প্রচেষ্টা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। তবে এই দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরের এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পারস্পরিক অভিযোগের ধরন। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি নুরিস্তানের কামদেশের দিকে প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে সাবেক সরকারের কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছে, যারা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের দাবি, আফগান ভূখণ্ড থেকেই সশস্ত্র ব্যক্তিরা তৎপরতা চালাচ্ছে। উভয় পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেখিয়ে দেয় যে এসব নিরাপত্তা ঘটনার দায়, উৎস এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এখনও গুরুতর ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
এই পুরো সমীকরণে ইসলামী ইমারতের অবস্থানও বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। পাকিস্তানের ধারাবাহিক অভিযোগ, ডুরান্ড লাইনকে ঘিরে চাপ এবং ২১ সেপ্টেম্বরের বিমান হামলার পর আফগান কর্মকর্তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা রক্ষার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে তলব করেছেন এবং প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা পরিস্থিতিকে বৃহত্তর যুদ্ধে পরিণত হওয়া থেকে রোধ করার প্রচেষ্টাও চালিয়েছেন। ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে এই অবস্থানকে সংকটের আরও বিস্তার ঠেকানোর প্রচেষ্টার কাঠামোর মধ্যেই দেখা উচিত।
সামগ্রিকভাবে সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ, কোহাট থেকে কুনার এবং ডেরা ইসমাইল খান থেকে নুরিস্তান পর্যন্ত, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকটগুলো কি কেবল নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে, নাকি এগুলো রাজনৈতিক চাপ, সামরিক পদক্ষেপ, প্রচারণামূলক পরিবেশ এবং আঞ্চলিক কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্যও ব্যবহৃত হচ্ছে? আফগানিস্তানের ওপর পাকিস্তানের অব্যাহত নিরাপত্তাগত চাপ এবং আফগানিস্তানের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা সুরক্ষার প্রচেষ্টা ভবিষ্যৎ পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তাই ভবিষ্যতে কোনো বড় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটলে দায় নির্ধারণের আগে অন্তত তিনটি মৌলিক বিষয় স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। হামলাকারীরা কারা ছিল, হামলার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনার পর রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত বা কৌশলগতভাবে কোন পক্ষ লাভবান হয়েছে। এসব প্রশ্নের সতর্ক ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ছাড়া কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হলে তা অঞ্চলটির সংকট ও পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর করে তুলতে পারে।





















