আবু উবাইদাহ: আন-নূর মসজিদ থেকে আর-রিমালে শাহাদাত পর্যন্ত!

✍🏻 আবদুল বাসির উমরী

আবু উবাইদাহ ছিলেন সেই মুখোশধারী ব্যক্তি, যিনি ৭ই অক্টোবরের পর সংবাদ ও গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হয়েছিলেন। এমন এক নেপথ্যচারী মানুষ, যাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল এই উম্মাহর ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের জন্য মলম আর শত্রুদের বক্ষের জন্য বিষাক্ত তীর। তিনি ঢাকা মুখে সামনে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু উন্মোচন করে দিয়েছিলেন বহু মুখোশধারীর প্রকৃত রূপ।

আবু উবাইদাহ ২ অক্টোবর ২০০৪ সালে জাবালিয়া ক্যাম্পের ‘মসজিদ আন-নূর’-এ কাসসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র হিসেবে তাঁর প্রথম ভাষণটি শেষ করেছিলেন এই চমৎকার বাক্যটি দিয়ে: «وَإِنَّهُ لَجِهَادٌ، نَصْرٌ أَوِ اسْتِشْهَادٌ» (নিশ্চয়ই এটি জিহাদ; হয় বিজয়, নয়তো শাহাদাত)। এটি এমন এক বাক্য ছিল যার প্রতিটি উচ্চারণে লুকিয়ে ছিল গভীর অর্থ; এই পবিত্র পথের গন্তব্য কেবল দুটি পরিণতির একটি—বিজয় অথবা শাহাদাত; আর মুমিনের জন্য উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে সফলতা।

যেহেতু জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী আবু উবাইদাহর বক্তব্যের গভীর প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল না, তাই তারা তাদের নিরাপত্তা ও সামরিক তালিকায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি শীর্ষে রেখেছিল। বিভিন্ন হুমকি থেকে শুরু করে তাঁর আসল পরিচয় জানার চেষ্টা, সাইবার হামলা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধই সবকিছুই প্রমাণ করেছে যে, জায়নবাদী শত্রু সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই “শব্দ” বা “বাণী”কে, যা অনুপ্রেরণা দেয়, জনমত গঠন করে এবং যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দেয়।

এই নিরন্তর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়নি। ৩০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে গাযযা শহরের আর-রিমাল এলাকায় একটি ভবনে বিমান হামলা চলাকালীন আবু উবাইদাহ শহীদ হন। কিন্তু মুখোশের আড়ালের এই ব্যক্তিটি আসলে কে ছিলেন? সেই সুসংবাদবাহী কণ্ঠস্বর, যা মুসলিমদের জন্য ছিল আশার বাণী আর জায়নবাদী ও তাদের মিত্রদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করত।

হুযাইফা সামির আবদুল্লাহ আল-কাহলুত, যিনি আবু উবাইদাহ এবং আবু ইবরাহিম নামে পরিচিত ছিলেন, ফিলিস্তিনি জিহাদের অন্যতম প্রধান মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হতেন, বিশেষ করে ৭ই অক্টোবরের পর। তিনি সর্বদা লাল রুমাল এবং সামরিক পোশাকে আবির্ভূত হতেন এবং নিজের পরিচয় জনসাধারণের কাছে গোপন রাখতেন। তাঁর জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ সালে গাযযা উপত্যকায়। তাঁর পরিবার নিলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিল, যারা ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হয়ে গাযযায় হিজরত করে। পরবর্তীতে তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় জাবালিয়া ক্যাম্প এবং গাজার অন্যান্য এলাকায় অতিবাহিত করেন।

আবু উবাইদাহ কাসসাম ব্রিগেডের মিডিয়া কার্যক্রমের শুরুর দিকেই সামনে আসেন এবং খুব অল্প সময়ে কাসসামের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে পরিণত হন। গণমাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য উপস্থিতির সূচনা হয় ২ অক্টোবর ২০০৪ সালে মসজিদ আন-নূর-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে, যেখানে ‘আইয়ামুল গাযাব’ (ক্রোধের দিনসমূহ) অভিযানের ঘোষণা তাঁর ভূমিকাকে উজ্জ্বল করে তোলে। এরপর তাঁর দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়—মিডিয়া বিভাগ তত্ত্বাবধান, কাসসামের মনস্তাত্ত্বিক ও সাইবার যুদ্ধ পরিচালনা, বিবৃতি প্রকাশ, অভিযানের ভিডিও এবং বন্দি ও সতর্কবার্তা সংক্রান্ত ঘোষণা প্রদান।

বছরের পর বছর ধরে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং কৌশলপূর্ণ বার্তার মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনি সংগ্রামের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন; ‘ভঙ্গুর বিভ্রম’ (Broken Illusion) অভিযানের ঘোষণা থেকে শুরু করে গিলাদ শালিতকে বন্দি করা, পশ্চিম তীর দখল পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, ২০২১ সালের লড়াইয়ের সময়কার প্রভাবশালী বক্তব্য এবং ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের ‘তুফান আল-আকসা’ অভিযানে তাঁর কেন্দ্রীয় অংশগ্রহণ পর্যন্ত।

মিথ্যা স্লোগানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাতেল শক্তির দেয়ালকে আরও কাঁপিয়ে দিয়েছিল এই সত্য যে, আবু উবাইদাহ ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি ছিলেন। কেবল এজন্যই যে, তিনি সেই মযলুম জাতির কষ্টের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন যারা জায়নবাদী যুলুমের কারণে দীর্ঘকাল বন্দি অবস্থায় আছে। অথচ এই একই শক্তিগুলো বাক-স্বাধীনতার বড় বড় বুলি আউড়ে পৃথিবীকে বোকা বানিয়ে রেখেছে।

এমন এক সময়ে যখন মুসলিম উম্মাহ তাঁর সেই সুসংবাদবাহী কণ্ঠস্বর পুনরায় শোনার অপেক্ষায় ছিল, জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী একটি বিমান হামলায় ফিলিস্তিনি সংগ্রামের অন্যতম এই মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। এই পদক্ষেপটি কাসসামের মিডিয়া কাঠামোর ওপর একটি আঘাত হলেও, এটি মুজাহিদদের মনোবল ও লক্ষ্যকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

হ্যাঁ! আবু উবাইদাহ ৩০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আল-রিমালে এক বিমান হামলায় শহীদ হন। যদিও সেই সময় কাসসাম ব্রিগেড নীরবতা পালন করেছিল, কিন্তু একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর শাহাদাত, তাঁর প্রকৃত নাম হুযাইফা সামির আবদুল্লাহ আল-কাহলুত এবং উপাধি ‘আবু ইবরাহিম’ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

যদিও জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী বহু চেষ্টার পর আবু উবাইদাহর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু এই উম্মাহর মধ্যে, যেমনটা আবু উবাইদাহ নিজেই বলতেন—একজন কমান্ডারের জায়গায় বহু কমান্ডার, একজন সৈন্যের জায়গায় দশজন সৈন্য এবং একজন শহীদের জায়গায় হাজার হাজার মুজাহিদ দাঁড়িয়ে যাবে। এই মাটি ঠিক সেভাবেই মুজাহিদদের জন্ম দেয়, যেভাবে জলপাই গাছ ফলে-ফুলে বিকশিত হয়।

Exit mobile version