গাযযায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলা এবং নিরপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ড এক চরমতম মানবিক বিপর্যয়। তবে ইতিহাসের নিজস্ব এক অনড় যুক্তি রয়েছে, নিপীড়নের অবসান অনিবার্য, এবং অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা কখনোই টিকে থাকে না। হামাসের শীর্ষ নেতা ও জিহাদি কমান্ডার ইজ্জুদ্দীন আল-হাদ্দাদ (রহ.)-এর শাহাদাত যেমন শত্রুর চরম বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক, তেমনি এটি পরোক্ষভাবে প্রতিরোধের সারিতে নতুন এক সংকল্পের জন্ম দিয়েছে।
ইসলামী ইতিহাস বারবার এই সত্য প্রমাণ করেছে। যখন কোনো কমান্ডার বা নেতা শহীদ হন, তখন জিহাদের অগ্রযাত্রা দুর্বল হয়ে পড়ে না। প্রতিটি রক্তের ফোঁটা মুজাহিদদের মনে নতুন এক স্পৃহা জোগায়। যারা প্রতিরোধের পথে হাঁটেন, তাদের কাছে নেতাদের শাহাদাত কোনো পরাজয় নয়। এটি জনগণকে জাগ্রত করে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাধীনতার ক্ষুধা আরও তীব্র করে এবং সামরিক চাপ ও নিপীড়নের মুখে পুরো জাতির ইচ্ছাশক্তিকে ইস্পাতের চেয়েও কঠিন করে তোলে।
ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ইসলামী আন্দোলন হামাস সীমিত সম্পদ এবং শক্তির চরম ভারসাম্যহীনতা সত্ত্বেও, গাযযায় ইসরায়েলের আধুনিক সামরিক যন্ত্রের অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
কিছুদিন আগেও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী বারবার দাবি করছিল যে হামাস পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, পতনের মুখে। কিন্তু মুজাহিদিনরা আত্মত্যাগ ও ধৈর্যের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন যা এই শাসকগোষ্ঠী বিশ্বাস করতে চায়নি, বৈষয়িক চাপের মুখে বিশ্বাস এবং আদর্শ কখনো ধূলিসাৎ হয় না। এই আন্দোলন আজও মাঠে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
হামাসের প্রতি এই প্রশংসা কেবল তাদের সামরিক কৌশলের জন্য নয়। এটি তাদের বিশ্বাসের গভীরতা এবং নেতৃত্বের সেই গুণাবলীর জন্য, যা পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও খাদ্য অবরোধের মধ্যেও গাজার মানুষকে অবিচল রেখেছে এবং তাদের বাস্তুচ্যুত ও বিচ্ছিন্ন করার শত্রুর সমস্ত পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
হামাস এখন কেবল একটি সংগঠনের চেয়েও বড় কিছুতে পরিণত হয়েছে। এটি ফিলিস্তিনি পরিচয় এবং তাদের বৈধ অধিকারের দাবির এক বৈশ্বিক প্রতীকে রূপ নিয়েছে—এমন এক বাস্তবতা, যাকে ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব।
এই যুদ্ধ হলো আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির বিরুদ্ধে ঈমান এবং অসামান্য ধৈর্যের এক জীবন্ত রূপকথা। স্থলযুদ্ধ এবং সামরিক কৌশলের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দখলদার বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতে তারা বেসামরিক অবকাঠামো, হাসপাতাল, স্কুল এবং নিষ্পাপ শিশুদের ওপর বোমা বর্ষণ করছে। আধুনিক ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমানও সেইসব তরুণের মনোবল ভাঙতে পারেনি, যাদের এই ভূমি তাদের বাবা-দাদাদের উত্তরাধিকার।
বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আজ বিস্মিত হয়ে ভাবছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে অবরুদ্ধ ও সম্পদহীন এক টুকরো ভূমি কীভাবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর অহংকারকে মাটিতে মিশিয়ে দিল এবং তাদের সামরিক মর্যাদাকে ধুয়ে মুছে দিল। এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে সেই মায়েদের কাছে—যাঁরা তাঁদের শহীদ সন্তানদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে বিলাপের বদলে গর্ব ও প্রতিরোধের বাণী উচ্চারণ করেন এবং বিশ্ব বিবেককে বার্তা দেন, স্বাধীনতার মূল্য যতই চড়া হোক না কেন, নতজানু হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে তার মর্যাদা অনেক বেশি।
সামগ্রিকভাবে, গণহত্যা এবং ঘরবাড়ি ধ্বংসের কৌশলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের এই অবিচলতা ও প্রতিরোধ আমাদের সময়ে সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার লড়াইয়ের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। বাস্তব চিত্র এটাই দেখায় যে, শহীদদের পবিত্র রক্ত যোদ্ধাদের সারিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে; কারণ প্রতিটি ধসে পড়া ভবন এবং প্রতিটি কেড়ে নেওয়া নিরপরাধ প্রাণের ছাই থেকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নতুন নতুন যোদ্ধার জন্ম হয়।
ফিলিস্তিনের আজকের প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃত বিজয় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র থাকা পক্ষের হয় না। বিজয় কেবল তাদেরই হয় যাদের ঈমান সবচেয়ে মজবুত এবং সত্যের প্রতি যারা সবচেয়ে নির্ভীক। আর এই বিশাল আত্মত্যাগই শেষ পর্যন্ত দখলদার শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পতন এবং ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তির পথকে সুগম করবে।
