কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও তার জবাব
শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি
দেওবন্দি আকাবির আলেমদের অন্যতম শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর ইরশাদাতে মাদানী গ্রন্থের ২২১ পৃষ্ঠায় এমন একটি বক্তব্য রয়েছে, যেখানে সেই ব্যক্তির কুফরের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের কাতারে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে। বক্তব্যটি হলো:
“মুসলমান হত্যার তৃতীয় ধরন হলো—কোনো মুসলমান কাফেরদের সঙ্গে থেকে তাদের বিজয় ও সাফল্যের জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, অথবা যুদ্ধে তাদের সহযোগিতা করে। যখন মুসলমান ও অমুসলিমদের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে, তখন সে অমুসলিমদের পক্ষ অবলম্বন করে। এটি এই অপরাধের কুফর ও সীমালঙ্ঘনের চরমতম রূপ এবং ঈমানের মৃত্যু ও ইসলামের বিলুপ্তির এমন এক ভয়াবহ অবস্থা, যার চেয়ে অধিক কুফর ও কাফরির কল্পনাও করা যায় না।”
— ইরশাদাতে মাদানী, পৃষ্ঠা ২২১
ব্যাখ্যা
হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর উল্লিখিত বক্তব্য সালাফে সালেহীন এবং আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ প্রাচীন ও পরবর্তী আলেমের মতের বিরোধী নয়। সালাফ ও অধিকাংশ প্রাচীন-পরবর্তী আলেমের বক্তব্য হলো, কোনো ব্যক্তি যদি কাফেরদের কাতারে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং তার কোনো দুনিয়াবি উদ্দেশ্য বা স্বার্থ না থাকে; বরং শুধু এই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে যে কাফেররা বিজয়ী হোক এবং মুসলমানরা পরাজিত হোক, তাহলে এটি কুফর। কারণ এটি স্পষ্ট প্রমাণ যে ওই ব্যক্তি ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করে এবং কুফর ও কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা রাখে। ইসলাম ও মুসলমানদের মোকাবিলায় কাফেরদের কিংবা কোনো কুফরভিত্তিক ধর্মের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা কুফর।
তবে কেউ যদি কোনো দুনিয়াবি উদ্দেশ্য বা স্বার্থ, যেমন অর্থ, পারিবারিক আত্মীয়তা, জাতীয়তাবাদী পক্ষপাত কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যের কারণে কাফেরদের সমর্থন করে, তাহলে তা কবিরা গুনাহ, কুফর নয়। তবে এটি কুফরের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। কারণ এ ধরনের কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার অন্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা সৃষ্টি হতে পারে এবং কুফর ও কাফেরদের প্রতি ভালোবাসার জন্ম হতে পারে। এ বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সালাফ এবং অধিকাংশ প্রাচীন ও পরবর্তী আলেমের একাধিক দলিল ও বক্তব্য উল্লেখ করেছি।
মাসিক দারুল উলূম দেওবন্দ-এর জমাদিউস সানি ১৪৩৪ হিজরি, এপ্রিল ২০১৩ সংখ্যায় খেলাফত আন্দোলন ও তর্কে-মুওয়ালাত আন্দোলনে হযরত মাদানী (রহ.)-এর ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হযরত মাদানী (রহ.) কাফেরদের সঙ্গে মুওয়ালাতকে হারাম বলেছেন, কুফর বলেননি।
তবে তিনি তাকফিরও করেছেন, কিন্তু হারামকে হালাল মনে করার ভিত্তিতে। দারুল উলূম দেওবন্দ-এর মাসিকের ভাষ্য হলো:
“আপনি ঘোষণা করলেন, ‘ব্রিটিশ সরকারের সেনাবাহিনীতে যোগদান করা হারাম।’ আপনি মানুষকে বোঝালেন যে, ব্রিটিশদের নোংরা নীতি ভারতীয় সৈন্যদের মাধ্যমে মুসলমানদের হত্যা করাচ্ছে। তারা তাদের ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ লুট করছে, তাদের অপমান ও অসম্মান করছে। কোনো সৈনিক যদি এসব কাজকে নিজের জন্য হালাল মনে করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্রিটিশ সরকারের কোনো ধরনের সাহায্য করা হারাম; সব ধরনের মুওয়ালাত ও সহযোগিতা হারাম; মুসলমানদের ওপর তর্কে-মুওয়ালাত ফরজ।”
এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরি বা নিয়োগকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু কেউ যদি উল্লিখিত অপরাধগুলোকে নিজের জন্য হালাল মনে করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। এটি স্বীকৃত বিষয় যে, আল্লাহ যেটিকে হারাম করেছেন সেটিকে হালাল মনে করা, অথবা ইসলামের মোকাবিলায় কুফরের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা কুফর।
───
মুফতি আজমে হিন্দ মুফতি কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.)
যে সময়ে তর্কে-মুওয়ালাত আন্দোলন চলছিল, সে সময়ে আলেমদের একটি বিশেষ দল ছাড়া অধিকাংশ আলেম ও মুসলমান এই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। আলেমরা তর্কে-মুওয়ালাতকে ফরজ মনে করতেন এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে মুওয়ালাতকে হারাম বলতেন, কুফর বলতেন না। যারা মুওয়ালাত অবলম্বন করেছিল, তাদের তারা ফাসিক ও জালিম মনে করতেন; কাফের বা মুরতাদ বলতেন না।
যেমন মুফতি আজমে হিন্দ মুফতি কিফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.) একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছেন:
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রু, ইসলামের শত্রু এবং মুসলমানদের শত্রুদের সঙ্গে তর্কে-মুওয়ালাত করা থেকে বিরত থাকা একটি দ্বীনি ফরজ। এ বিষয়ে কুরআন মাজিদে সুস্পষ্ট বিধান এবং ব্যাখ্যার কোনো অবকাশ নেই—এমন অকাট্য বক্তব্য রয়েছে। দুপুরবেলায় সূর্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করা সম্ভব, কিন্তু কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান রাখে এমন ব্যক্তির জন্য তর্কে-মুওয়ালাতের ফরজিয়ত অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
কুরআন মাজিদে শুধু এক-দুই জায়গায় নয়, বরং বহু স্থানে এই মহান ফরজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং যারা তা পালন করে না, তাদের আল্লাহর শাস্তি ও মহাক্রোধের ভয় দেখানো হয়েছে।
এক স্থানে ইরশাদ হয়েছে:
﴿لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهٗ﴾
অর্থাৎ, ‘হে নবী! আপনি এমন কোনো সম্প্রদায়কে পাবেন না, যারা আল্লাহ তাআলার পবিত্র সত্তা ও কিয়ামতের দিনের প্রতি ঈমান রাখে, অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শত্রুদের সঙ্গে মুওয়ালাত—অর্থাৎ বন্ধুত্ব ও সাহায্য-সহযোগিতার সম্পর্ক রাখে।’
অর্থাৎ এভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর শত্রু ও কিয়ামতের দিনকে অস্বীকারকারীদের সঙ্গে মুওয়ালাত—এ দুটি বিষয় এতটাই পরস্পরবিরোধী যে, একই অন্তরে তা একত্রিত হতে পারে না।
দ্বিতীয় স্থানে ইরশাদ হয়েছে:
﴿يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّيْ وَعَدُوَّكُمْ اَوْلِيَآءَ﴾
অর্থাৎ, ‘হে ঈমানদারগণ! আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না।’ অর্থাৎ তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করো না।
তৃতীয় স্থানে ইরশাদ হয়েছে:
﴿اِنَّمَا يَنْهٰىكُمُ اللّٰهُ عَنِ الَّذِيْنَ قَاتَلُوْكُمْ فِى الدِّيْنِ وَاَخْرَجُوْكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوْا عَلٰٓى اِخْرَاجِكُمْ اَنْ تَوَلَّوْهُمْ ۚ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ فَاُولٰئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ﴾
অর্থাৎ, ‘যারা তোমাদের সঙ্গে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদের বের করে দেওয়ার কাজে সহযোগিতা করেছে, আল্লাহ তাআলা তোমাদের তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করতে নিষেধ করছেন। আর যারা তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করবে, তারাই জালিম।’
বর্তমানে যেসব ইসলামের শত্রুর সঙ্গে তর্কে-মুওয়ালাতের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে এই তিনটি বিষয়ই পুরোপুরি বিদ্যমান—দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং উচ্ছেদের কাজে সহযোগিতা। তারা এই তিনটি কাজই করেছে। অতএব কুরআন মাজিদের এই সুস্পষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী এসব ইসলামের শত্রুর সঙ্গে মুওয়ালাত হারাম এবং যারা মুওয়ালাত করবে তারা জালিম।”
— কিফায়াতুল মুফতি, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪১২
───
ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি
কখনো কখনো কিছু আকাবিরের বক্তব্য থেকে এমন ভুল ধারণা সৃষ্টি হয় যে, তাঁরা যেন মুওয়ালাতকে নিরঙ্কুশভাবে কুফর ও রিদ্দাহ বলেছেন। যেমন ইমাম আবু বকর জাসসাস (রহ.)-এর নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে এমন ধারণা হতে পারে।
বক্তব্য
“কোনো কাফের কোনো মুসলমানের ওলি হতে পারে না। এই আয়াতে প্রমাণ রয়েছে যে, কোনো কাফের মুসলমানের ওপর কর্তৃত্ব বা তার সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার ওলি হতে পারে না। এই আয়াত কাফেরদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সঙ্গে শত্রুতা করা ফরজ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কারণ মুওয়ালাত শত্রুতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
যখন আমাদের ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাদের কুফরের কারণে শত্রুতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন তাদের ছাড়া অন্যান্য কাফেরও একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই আয়াত আরও প্রমাণ করে যে, কুফর একটি অভিন্ন মিল্লাত।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ﴾
এটি প্রমাণ করে যে, ইহুদি খ্রিস্টানের ওলি হতে পারে—যখন সে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা উন্মাদ হয়; যেমন নিহত ব্যক্তি যদি ইহুদি হতো, তাহলে তার উত্তরাধিকারী ইহুদিই হতো। একইভাবে তাদের মধ্যে বিবাহের অভিভাবকত্বও একই রকম।
এ আয়াত থেকে আরও জানা যায় যে, তাদের পারস্পরিক ওলিয়াতের কারণে তাদের মধ্যে উত্তরাধিকার বৈধ। আর আমরা যেমন উল্লেখ করেছি, কুফর একটি অভিন্ন মিল্লাত—যদিও তাদের ধর্ম ও পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন।
এ থেকে আরও জানা যায় যে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে পারস্পরিক বিবাহ বৈধ; অর্থাৎ ইহুদি পুরুষ খ্রিস্টান নারীকে এবং খ্রিস্টান পুরুষ ইহুদি নারীকে বিবাহ করতে পারে। এসব বিধান তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আহলে কিতাব ও অনাহলে কিতাবের বিধানে পার্থক্য রয়েছে—বিশেষত বিবাহ ও জবিহা বৈধ হওয়ার ক্ষেত্রে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾
এটি প্রমাণ করে যে, বনু তাগলিবের খ্রিস্টানদের বিধান বনু ইসরাইলের খ্রিস্টানদের মতোই; অর্থাৎ তাদের জবিহা খাওয়া এবং তাদের নারীদের সঙ্গে বিবাহের ক্ষেত্রে একই বিধান। ইবন আব্বাস ও হাসান থেকেও এ মত বর্ণিত হয়েছে।
আর ﴿مِنْكُمْ﴾ দ্বারা আরবদের বোঝানো হতে পারে। কারণ এর দ্বারা যদি মুসলমানদের বোঝানো হতো, তাহলে যে ব্যক্তি কাফেরদের সঙ্গে মুওয়ালাত করত, সে মুরতাদ হয়ে যেত।”
ব্যাখ্যা
এখানে মুওয়ালাত দ্বারা পূর্ণাঙ্গ মুওয়ালাত বোঝানো হয়েছে, যাকে কেউ কেউ ‘মুওয়ালাতে তাম্মাহ’ বা ‘মুওয়ালাতে মুতলাকাহ আম্মাহ’ বলে থাকেন। মুওয়ালাতে তাম্মাহ বলতে সেই মুওয়ালাত বোঝায়, যা আকিদাগত বিকৃতির ভিত্তিতে সংঘটিত হয়। কারণ সালাফদের কাছে মুওয়ালাতের প্রতিটি ধরন কুফর নয়। বরং সালাফগণ একে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেছেন। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এবং অন্যান্য সালাফ ও আকাবিরের বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি ইতিপূর্বে স্পষ্ট করা হয়েছে।
কারণ যদি মুওয়ালাতের প্রতিটি ধরন কুফর ও রিদ্দাহ হতো, তাহলে হযরত হাতিব ইবন আবি বালতাআ (রা.), আবু লুবাবা ইবনুল মুনযির (রা.), সাদ ইবন উবাদাহ (রা.) এবং ফুরাত ইবন হাইয়ান (রা.)-ও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতেন। কারণ পূর্বে উল্লেখ করা তাঁদের কিছু কাজ মুওয়ালাতের একটি প্রকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যেমন হাফেজ ইবন তাইমিয়াহ (রহ.) মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৫২৩-এ বলেছেন:
“কখনো কোনো মুসলমান কোনো কাফেরকে ভালোবাসে অথবা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার সঙ্গে সহযোগিতা করে। যদিও এটি গুনাহ, কিন্তু কুফর নয়। কারণ সে এ কাজ আকিদার ভিত্তিতে করেনি; বরং আত্মীয়তা কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনের কারণে করেছে। যেমনটি ঘটেছিল হাতিব ইবন আবি বালতাআ (রা.)-এর সঙ্গে।”
এরপর তিনি বলেন:
الأصل الثاني: أن شعب الإيمان قد تتلازم عند القوة ولا تتلازم عند الضعف، فإذا قوي ما في القلب من التصديق والمعرفة والمحبة لله ورسوله أوجب بغض أعداء الله، كما قال تعالى: ﴿وَلَوْ كَانُوْا يُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالنَّبِىِّ وَمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوْهُمْ اَوْلِيَآءَ﴾ وقال: ﴿لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهٗ وَلَوْ كَانُوْا اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَاءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِيْرَتَهُمْ ۚ اُولٰٓئِكَ كَتَبَ فِىْ قُلُوْبِهِمُ الْاِيْمَانَ وَاَيَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ﴾.
অর্থাৎ:
“ঈমানের বিভিন্ন শাখা শক্তিশালী অবস্থায় পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে; কিন্তু দুর্বল অবস্থায় সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য থাকে না। যখন অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি সত্যায়ন, জ্ঞান ও ভালোবাসা শক্তিশালী হয়, তখন তা আল্লাহর শত্রুদের প্রতি ঘৃণা আবশ্যক করে দেয়।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿وَلَوْ كَانُوْا يُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالنَّبِىِّ وَمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوْهُمْ اَوْلِيَآءَ﴾
‘তারা যদি আল্লাহ, নবী এবং তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর ঈমান রাখত, তাহলে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না।’
এবং তিনি বলেছেন:
﴿لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهٗ وَلَوْ كَانُوْا اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَاءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِيْرَتَهُمْ ۚ اُولٰٓئِكَ كَتَبَ فِىْ قُلُوْبِهِمُ الْاِيْمَانَ وَاَيَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ﴾
‘আপনি এমন কোনো সম্প্রদায় পাবেন না, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে অথচ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতা করে, তাদের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক রাখে—যদিও তারা তাদের পিতা, সন্তান, ভাই অথবা গোত্রের লোক হয়। এদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা তাদের শক্তিশালী করেছেন।’”
“আবার কখনো কোনো ব্যক্তির আত্মীয়তা বা প্রয়োজনের কারণে কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এটি এমন একটি গুনাহ, যা তার ঈমানকে দুর্বল করে; কিন্তু এর কারণে সে কাফের হয়ে যায় না।
যেমন হযরত হাতিব ইবন আবি বালতাআ (রা.)-এর ঘটনা। তিনি মুশরিকদের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু সংবাদ লিখে পাঠিয়েছিলেন। এ ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করেন:
﴿يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّيْ وَعَدُوَّكُمْ اَوْلِيَآءَ تُلْقُوْنَ اِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ﴾
‘হে ঈমানদারগণ! আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না; তোমরা তাদের প্রতি ভালোবাসা নিক্ষেপ কর।’
একইভাবে সাদ ইবন উবাদাহ (রা.) ইফকের ঘটনায় আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের পক্ষে সমর্থন করেছিলেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এর আগে তিনি একজন সৎ ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব তাকে এ দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
এই সন্দেহের কারণেই হযরত উমর (রা.) হাতিবকে মুনাফিক বলেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘সে এমন ব্যক্তি, যে বদরে অংশগ্রহণ করেছে।’
এই সন্দেহের কারণেই হযরত উমর (রা.) তাঁকে মুনাফিক বলেছিলেন।
একইভাবে উসাইদ ইবন হুদাইর (রা.) সাদ ইবন উবাদাহকে বলেছিলেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি তো একজন মুনাফিক, যে মুনাফিকদের পক্ষ অবলম্বন করছ।’”
───
একইভাবে আল্লামা ইবন আশুর (রহ.) তাঁর তাফসির আত-তাহরির ওয়াত-তানভীর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৩০-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
﴿يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا الْيَهُوْدَ وَالنَّصٰرٰٓى اَوْلِيَآءَ ۘ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ ۚ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ ۗ اِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ﴾
তিনি বলেন:
“বাহ্যিকভাবে এই আয়াতের দাবি হলো—কাফেরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা তাদের ধর্মে প্রবেশ করার সমতুল্য। কারণ ‘তাদের অন্তর্ভুক্ত’ হওয়ার অর্থ তাদের ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছাড়া পূর্ণ হয় না।
কিন্তু কোনো মুসলমান যতক্ষণ সঠিক আকিদা পোষণ করে—অর্থাৎ ঈমান রাখে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে এবং মুনাফিক না হয়—ততক্ষণ সে অবশ্যই মুমিন। অতএব এই আয়াতের ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
মুফাসসিরগণ এর দুটি ব্যাখ্যা করেছেন।
হয় ‘মুওয়ালাত’ দ্বারা পূর্ণাঙ্গ মুওয়ালাত বোঝানো হবে—যে মুওয়ালাতের মধ্যে তাদের ধর্মের প্রতি সন্তুষ্টি এবং ইসলামের ধর্মের প্রতি নিন্দা ও সমালোচনা রয়েছে।
অথবা ﴿فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾—‘সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’—এর দ্বারা শক্তিশালী উপমা বোঝানো হবে; অর্থাৎ শাস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সে তাদেরই একজনের মতো।
ইবন আতিয়্যাহ (রহ.) বলেন: যে ব্যক্তি নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে—যেমন সমর্থন ইত্যাদির মাধ্যমে—তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করে, কিন্তু তাদের আকিদা গ্রহণ করে না এবং তার ঈমানে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না, সে নিন্দা ও শাস্তির দিক থেকে তাদের সঙ্গে গণ্য হবে। আহলে সুন্নাতের আলেমগণ এ বিষয়ে একমত যে, যতক্ষণ কোনো ব্যক্তি কুফরকে পছন্দ না করে এবং কাফেরদের সমর্থনও সেই ভিত্তিতে না করে, ততক্ষণ সে ইসলাম থেকে বের হয় না। তবে এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের গোমরাহি।”
ইবন আশুর (রহ.) এরপর মুওয়ালাতের একটি ভয়ংকর ধরনের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আন্দালুসের কিছু সেনাপতি ও যোদ্ধা করেছিল। তারা নাসারাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এ বিষয়ে আন্দালুসের আলেমদের কাছেও একটি ইস্তিফতা করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাদের কুফরের ফতোয়া দেননি; বরং বলেছেন, এটি বড় গুনাহ এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবাধ্যতায় সহযোগিতা।
ইবন আশুর (রহ.) বলেন, যেসব ফকিহ এই ইস্তিফতার জবাবে উল্লিখিত আয়াত দ্বারা দলিল গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা ওই ব্যক্তিদের তাকফির করেননি; বরং আয়াতটিকে তাওয়িলের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, আন্দালুসের সেনাপতি ও যোদ্ধারা যে মুওয়ালাত করেছিল, তা কাফেরদের প্রতি কুফরভিত্তিক মুওয়ালাতের পর মুওয়ালাতের সবচেয়ে নিম্ন স্তর।
তিনি বলেন:
وقوله: ﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾ (من) شرطية تقتضي أن كل من يتولاهم يصير واحدا منهم، جعل ولايتهم موجبة كون المتولي منهم، وهذا بظاهره يقتضي أن ولايتهم دخول في ملتهم؛ لأن معنى البعضية هنا لا يستقيم إلا بالكون في دينهم. ولما كان المؤمن إذا اعتقد عقيدة الإيمان واتبع الرسول ولم ينافق كان مسلما لا محالة، كانت الآية بحاجة إلى التأويل، وقد تأولها المفسرون بأحد تأويلين: إما بحمل الولاية في قوله: ﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ﴾ على الولاية الكاملة التي هي الرضى بدينهم والطعن في دين الإسلام، وإما بتأويل قوله: ﴿فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾ على التشبيه البليغ، أي فهو كواحد منهم في استحقاق العذاب.
অর্থ:
“আল্লাহ তাআলার বাণী—﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾—এখানে ‘مَنْ’ শর্তবাচক অব্যয়। এর বাহ্যিক দাবি হলো, যে-ই তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করবে, সে তাদেরই একজন হয়ে যাবে। অর্থাৎ তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাহ্যিকভাবে এর দাবি হলো, তাদের সঙ্গে মুওয়ালাত করা তাদের মিল্লাতে প্রবেশ করারই সমতুল্য। কারণ এখানে ‘তাদের অন্তর্ভুক্ত’ হওয়ার অর্থ তাদের ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছাড়া সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।
কিন্তু কোনো মুমিন যখন ঈমানের আকিদা পোষণ করে, রাসুলের অনুসরণ করে এবং মুনাফিক হয় না, তখন নিঃসন্দেহে সে মুসলিম। তাই এই আয়াতের তাওয়িল বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়েছে।
মুফাসসিরগণ এর দুটি ব্যাখ্যা করেছেন:
প্রথমত, ﴿وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ﴾-এ ‘মুওয়ালাত’কে পূর্ণাঙ্গ মুওয়ালাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে—যার অর্থ তাদের ধর্মের প্রতি সন্তুষ্টি এবং ইসলামের ধর্মের প্রতি নিন্দা ও আক্রমণ করা।
দ্বিতীয়ত, ﴿فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ﴾—‘সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’—এর অর্থ শক্তিশালী উপমা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ শাস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সে তাদেরই একজনের মতো।”
এই আয়াতে মুওয়ালাত থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ, যখন এই আয়াত নাজিল হয়েছিল, তখন মুসলমানদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। তাদের চারপাশে ছিল মুনাফিক, দুর্বল ঈমানের মানুষ, ইহুদি ও মুশরিকরা। তাই উম্মাহর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে এমন প্রতিটি বিষয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা জরুরি ছিল, যা সন্দেহ বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।





















