নিরপরাধ বেসামরিক জনগণের গণহত্যা: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আরও একটি বড় অপরাধ!

✍🏻 ​হাসসান মুজাহিদ

পাকিস্তান তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল এবং বিদেশি শক্তিগুলোকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে বাহ্যিক নির্দেশনা ও চাপের মুখে পড়ে নিপীড়নের এক মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। এই নীতির অধীনে তারা নিরপরাধ আফগান বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমাবর্ষণ করছে, যার ফলে নারী, পুরুষ এবং ছোট শিশুদের মৃত্যু ঘটছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল একটি জাতির বিরুদ্ধে আগ্রাসনই নয়, বরং সমগ্র মানবতা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক চরম লঙ্ঘন।

এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো গত রাতে কাবুলের একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে (হাসপাতাল) হামলা, যার ফলে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং অনেকে আহত হয়েছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল এবং অসহায় সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি ইমারত আফগানিস্তান (IEA) দয়াপরবশ হয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং একটি সুস্থ জীবনের দিকে পরিচালিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে একত্রিত করেছিল।

দুর্ভাগ্যবশত, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল নিরপরাধ আফগানদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই অসহায় ও আত্মরক্ষায় অক্ষম ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর অজুহাতে এই নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আফগানদের ওপর চলমান পাকিস্তানি নৃশংসতা
বিশ্ব যখন পাকিস্তানকে একটি ইসলামি দেশ হিসেবে দেখে, তখন তাদের এই সত্যটি নিয়ে ভাবা উচিত যে পাকিস্তান কেবল নামেই একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এর ব্যবস্থা ও আইন ইসলাম থেকে অনেক দূরে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে এর সমস্ত কর্মকাণ্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত হয়। যদি কোনো অমুসলিম দেশ মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তবে তাকে ঐতিহাসিক শত্রুতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু যখন একটি প্রতিবেশী মুসলিম দেশ এমন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তখন বিষয়টি অনেক বেশি বেদনাদায়ক ও পরিতাপের হয়ে দাঁড়ায়; কারণ এটি ইসলামি ভ্রাতৃত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের এক চরম লঙ্ঘন।

আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং তার জন্য মহা শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৩)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণ হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩২)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে মুসলিম সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, তাকে তিনটি কারণ ছাড়া হত্যা করা বৈধ নয়: যদি সে কাউকে হত্যা করে, যদি বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করে এবং যদি সে ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
“কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপাচার এবং তাকে হত্যা করা কুফরি।” (সহীহ মুসলিম)

ইমাম নববী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন,
“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে হত্যা করা বৈধ মনে করে হত্যা করে, সে কাফির হয়ে যায়।” (শারহ আল-মুসলিম, ইমাম নববী)

এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সাধারণ আফগান নাগরিকরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কোনো পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা করেনি, তারা কোনো নৈতিক অবক্ষয়েও লিপ্ত নয় এবং তারা ইসলামও ত্যাগ করেনি। অতএব, উপরের ইসলামি দলিলগুলোর আলোকে পাকিস্তান কীভাবে নিরপরাধ আফগানদের হত্যাকে বৈধতা দেয় এবং তাদের দেশের আলেম ও মুফতিরা এই জঘন্য কাজের জন্য কী ধরনের অজুহাত বা ধর্মীয় সমর্থন প্রদান করেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।

মযলুম আফগানদের জন্য সুসংবাদ হলো এই যে, পাকিস্তান পতনের পথে রয়েছে। যেমনটি কাজী শুরায়হ (রহ.) বলেছেন, “যালেম শাস্তির অপেক্ষায় থাকে আর মযলুম বিজয় ও প্রতিদানের অপেক্ষায় থাকে।” [হিলয়াত আল-আউলিয়া, ৪/১৩২]

এটি মধ্যাহ্নের সূর্যের মতো স্পষ্ট যে, যেকোনো রাষ্ট্র যখন যুলুম শুরু করে, তখনই সে বিভিন্ন সমস্যা ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হয় এবং শেষ পর্যন্ত চরম অপমানের সাথে ক্ষমতাচ্যুত হয়—যদিও তার কাছে প্রচুর সম্পদ এবং বস্তুগত উন্নতি থাকে।

পাকিস্তান যদিও নিজের জন্য ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ নামটি বেছে নিয়েছে, কিন্তু যদি তারা তাদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তবে তাদের ক্ষমতা হারানো অনিবার্য। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) যেমন বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা একটি ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন যদিও সেটি অমুসলিম হয়, কিন্তু জালেম রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন না যদিও সেটি মুসলিম হয়।” (মজমু আল-ফাতাওয়া, ৬২/২৮)

আলহামদুলিল্লাহ! আফগান সরকার মুসলিম এবং তারা অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ পন্থা অবলম্বন করে, তারা যতক্ষণ আক্রান্ত না হয় ততক্ষণ কারো জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় না। আর যখন আগ্রাসন ঘটে, তখন তারা কেবল আগ্রাসনকারীর বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয় এবং অন্য মুসলমানদের জান-মালের পূর্ণ সম্মান বজায় রাখে। এর বিপরীতে পাকিস্তান তালেবান এবং সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। এটি স্পষ্ট প্রমাণ যে, বিদেশি ইশারায় পাকিস্তান চায় না আফগানরা শান্তি ও নিরাপত্তায় বসবাস করুক, বরং তারা ইসলামি ইমারতের জন্য সমস্যা তৈরি করতে এবং এর ব্যবস্থার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে চায়।

Exit mobile version