আরও একবার আফগানিস্তানের আকাশ এমন এক অপরাধের সাক্ষী হলো, যা প্রত্যেক স্বাধীন মানুষের বিবেককে ক্ষতবিক্ষত করে। গত রাতে কুনার, খোস্ত ও পাক্তিকার বেসামরিক এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলা কেবল আফগানিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের এক চরম লঙ্ঘনই ছিল না, বরং এই মাটির অসহায় ও নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এক ক্ষমাহীন অপরাধও বটে।
এই হামলায় এমন কিছু শিশু শহীদ হয়েছে, যারা এখনও জীবনের আনন্দ ও আলোর স্বাদটুকুও পায়নি। মায়েরা নিমজ্জিত হয়েছেন গভীর শোকের সাগরে, যে মায়েদের সন্তানদের নিয়ে একমাত্র আশা ছিল একটু শান্তি ও নিরাপত্তা। এমন কিছু পরিবার তাদের প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে, যাদের কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক দ্বন্দ্বে বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। এই তিক্ত সত্যটি আবারও প্রমাণ করল যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী নীতিমালার আসল শিকার সবসময়ই নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ।
পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী এখন অপরাধের এমন এক অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে, যা দেখে মনে হয় তারা যেন জায়নবাদী (ইসরায়েলি) শাসকগোষ্ঠীর রক্তপাতের পাঠশালা থেকে দীক্ষা নিয়ে এসেছে। যে শাসকগোষ্ঠী গাযযা ও ফিলিস্তিনে মায়ের কোলে থাকা শিশুদের নিশানা বানায়, হাসপাতাল ধ্বংস করে এবং বিদ্যালয়গুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়—তারই এক পূর্বদেশীয় রূপ যেন আজ পাকিস্তানে দেখা যাচ্ছে, যারা আফগানিস্তানে ঠিক একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি করছে।
কাবুলের ওমিদ মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতালে বোমাবর্ষণ আর গাযযার আল-আহলি হাসপাতালে বোমাবর্ষণের মধ্যে কি আসলেই কোনো পার্থক্য আছে? কুনারে আফগান শিশুদের হত্যা করা আর খান ইউনিসে ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করার মধ্যে তফাতটা কোথায়?
এর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; কেবল তফাত এটুকুই যে, এক অপরাধী খোলামেলাভাবে তার শত্রুতার কথা ঘোষণা করে, আর অন্যজন মুসলিম প্রতিবেশীর মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। এই কপটতা ও দুমুখো নীতিই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপরাধকে আরও বেশি জঘন্য ও লজ্জাজনক করে তুলেছে।
কোনো মানবিক, ইসলামি বা আইনি নীতিই বেসামরিক মানুষের বাড়িঘরে বোমাবর্ষণকে বৈধতা দিতে পারে না। যদি দাবি করা হয় যে এই হামলার উদ্দেশ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলা করা, তবে কেন শিশু ও নারীদের নিশানা করা হচ্ছে? কেন মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে? উত্তরটা পরিষ্কার। এই ধরনের হামলা নিরাপত্তার চেয়ে বরং কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ ও বিদেশি হস্তক্ষেপে জর্জরিত একটি জাতির ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখানোর উদ্দেশ্যেই বেশি করা হয়।
জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ঠিক একই ভাষা ব্যবহার করে—“কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে হামলা”, “হাসপাতালের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সামরিক স্থাপনায় আঘাত” এবং এমন আরও অসংখ্য মিথ্যাচার।
কিন্তু বিশ্ববাসী দেখেছে গাযযার ধ্বংসস্তূপের নিচে কারা প্রাণ হারিয়েছে শিশু, নারী, বৃদ্ধ এবং নিরীহ রোগীরা। পাকিস্তানও এখন আফগান নারী ও শিশুদের মাথার ওপর বোমা ফেলছে এবং দাবি করছে যে তারা সন্ত্রাসীদের আস্তানায় আঘাত হেনেছে। অপরাধটি যত বড়, এই মিথ্যাচারটিও ঠিক ততটাই বিশাল।
গত কয়েক দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বারবার দেখিয়েছে যে, তারা সংলাপ ও গঠনমূলক আলোচনার চেয়ে চাপ সৃষ্টি, হুমকি ও হস্তক্ষেপ করতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, আফগান জনগণ কখনোই হুমকির মুখে মাথা নত করেনি এবং বলপ্রয়োগের কাছে নতি স্বীকার করে নিজেদের মূল্যবোধ ও লক্ষ্যকে বিসর্জন দেয়নি। আফগানিস্তান এমন একটি দেশ, যার সন্তানেরা পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় বড় পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। যে জাতি দখলদারিত্ব, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং আরও হাজারো দুর্যোগ সহ্য করেছে, তারা কখনোই অন্যের খেয়ালখুশির কাছে নিজেদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে বলি দিতে দেবে না।
ফিলিস্তিনের মজলুম জনগণ যেমন সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও অবিচল রয়েছে, তেমনি আফগানিস্তানের মানুষও জোরজুলুম ও নিপীড়নের সামনে কখনো মাথা নিচু করবে না।
কুনার, খোস্ত এবং পাক্তিকায় যা ঘটেছে তা কেবল একটি সামরিক হামলা ছিল না। এটি ছিল মানবতা, সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এবং আমাদের অভিন্ন ইসলামি মূল্যবোধের ওপর এক আঘাত।
এমন এক সময়ে যখন মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বেশি ঐক্য ও সংহতির প্রয়োজন, তখন এই ধরনের বৈরী আচরণ কেবল পারস্পরিক অবিশ্বাসকে আরও গভীর করবে এবং এই অঞ্চলে সহিংসতাকে উসকে দেবে।
এইসব অপরাধের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল আফগান জাতির ক্ষোভকেই উসকে দিচ্ছে না, বরং নিজেদের ইসলামের ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের সারিতে দাঁড় করাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর যে অপরাধের বিরুদ্ধে তারা নীরব থাকে, আজ সেই একই রূপ পাকিস্তানের জন্য একটি আদর্শ মডেলে পরিণত হয়েছে। ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার দাবিদার একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে?
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা এবং সমস্ত জাগ্রত বিবেককে অবশ্যই এই অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। আফগান শিশুদের রক্তের সামনে নীরব থাকা কোনো নিরপেক্ষতা নয়; বরং এটি স্পষ্ট অন্যায় ও অপরাধের প্রতি চোখ বুজে থাকাই শামিল।
গাযযায় জায়নবাদীদের অপরাধের সামনে নীরবতা যেমন মানবতার কপালে এক লজ্জার কলঙ্কতিলক হয়ে রয়েছে, তেমনি আফগানিস্তানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপরাধের মুখে নীরবতাও মানবাধিকার রক্ষার দাবিদারদের জন্য একদিন এক বড় কলঙ্কের দাগ হয়ে দাঁড়াবে।
এই হামলায় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পবিত্র রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না। তাদের এই রক্ত আফগান জাতির দুঃখ-কষ্টের এক জীবন্ত সাক্ষী এবং এমন এক শাসকগোষ্ঠীর নীতির স্পষ্ট প্রমাণ, যারা সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চেয়ে আগ্রাসন ও বলপ্রয়োগের পথকেই বেছে নিয়েছে।
আফগানিস্তানের মানুষ আবারও প্রমাণ করবে যে, যদিও তাদের সন্তানদের কোরবানি দেওয়া হচ্ছে, তবুও তাদের মনোবল ভাঙেনি; যদিও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, তবুও স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার সংকল্প তাদের মনে আরও সুদৃঢ় হচ্ছে।
আর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জেনে রাখা উচিত যে, এই অপরাধের জবাব না দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
«وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ»
“আর তুমি কখনোই মনে করো না যে, জালিমরা যা করছে সে বিষয়ে আল্লাহ গাফেল (উদাসীন)।”





















