বর্তমান যুগে পৃথিবী যখন একটি একমেরু কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন আমরা এমন সব রাজনৈতিক স্রোত প্রত্যক্ষ করছি যা পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে ফেরাউনী দম্ভধারী আমেরিকার দাপট ও আধিপত্যের যুক্তিকে মারাত্মকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই যুক্তি এখন এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভূতপূর্ব প্রতিরোধের মুখে তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার শেষ মুহূর্তগুলো একটি লজ্জাজনক পিছুটান হিসেবেই গণ্য হয়েছে। যে হুমকির মাধ্যমে অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তা আবারও কূটনৈতিক পরিবর্তনের আবর্তে হারিয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি কেবল অহংকারী ও ফেরাউন-সদৃশ আমেরিকার ভাবমূর্তিকেই ম্লান করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে দিয়েছে: কঠোর সময়সীমা বা আল্টিমেটাম কি এখনো কোনো প্রকৃত গুরুত্ব বহন করে, নাকি এগুলো এখন কেবল আরেকটি চক্রের শুরু যা কাজের চেয়ে কথার মাধ্যমেই বেশি শেষ হয়?
গত কয়েক দশকের ইরানি জাতির ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বাইরের চাপ এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কেবল কোনো স্লোগান নয়, বরং একটি যাপিত বাস্তবতা। ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে এবং তাদের মনোবল ভেঙে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও, দেশটি তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং জাতীয় গৌরব বজায় রেখেছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে, সাহস এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি জাতির ওপর “চাপ প্রয়োগের যুক্তি” কাজ করে না।
রাজনৈতিক চাপ এবং আধিপত্যের যে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি, তা এখন তার শক্তি হারিয়েছে। তারা অন্যের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়, কিন্তু ইরানি জনগণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিশ্বের ভাগ্য কেবল হোয়াইট হাউসে বসে নির্ধারিত হয় না।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে, ইসলামী ইমারাত আফগানিস্তানের একটি দায়িত্বশীল এবং স্বাধীন ব্যবস্থা হিসেবে ধারাবাহিকভাবে জোর দিয়ে আসছে যে—আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, বিদেশি শক্তির প্রভাবে নয়। এই অবস্থান, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিশীলতা সমর্থন করে এবং পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া বিভাজনমূলক নীতি প্রত্যাখ্যান করে, তা মূলত একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
অন্যদিকে, ইরান ও আফগানিস্তানের স্বাধীন অবস্থানের বিপরীতে পাকিস্তানের সামরিক প্রভাবাধীন সরকারকে প্রক্সি রাজনীতির (proxy politics) কারণে সৃষ্ট এক সংকটে আটকা পড়া মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ; বিশেষ করে তার একটি টুইট যা প্রথমে অবচেতনভাবে একটি নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য অনুযায়ী পোস্ট করা হয়েছিল এবং পরে বিদেশি নির্দেশনায় দ্রুত সংশোধন করা হয়। এই ঘটনাটি পরিষ্কার করে দেয় যে, দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ ইসলামাবাদে নয়, বরং অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে নির্ধারিত হয়।
এই ধরনের চিত্রনাট্য অনুযায়ী রাজনীতি একটি জাতির স্বাধীনতা হরণের নামান্তর। পাকিস্তানের সামরিক প্রভাবাধীন সরকার যেভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো পরিচালনা করে এবং শক্তিশালী বিদেশি কুশীলবদের সন্তুষ্ট করতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেয়, তা এখন পুরো অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। একে প্রক্সি রাজনীতির ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
