শহীদ মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর: শাহাদাতের মাঝে অমরত্ব খুঁজে পাওয়া মুজাহিদ!

✍🏻 ​ইহসান

আফগানিস্তানের দীর্ঘ ও অশান্ত ইতিহাসে মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর নাম কেবল একজন সাধারণ নেতার নাম হিসেবে কখনোই লিপিবদ্ধ হয়নি। এটি লিপিবদ্ধ হয়েছে ঐশ্বরিক ইচ্ছা ও অবিচল বিশ্বাসের এক প্রতীক হিসেবে। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি বীরত্বের সাথে দূরদর্শিতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন এবং উভয় ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।

তিনি এমন কিছু প্রমাণ করেছিলেন যা খুব কম মানুষই পারে, একজন মুজাহিদ যুদ্ধের পরিখায় বুকে বুলেট স্বাগত জানাতে পারেন, আবার একই জীবদ্দশায় এক খণ্ডিত উম্মাহকে একক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধও করতে পারেন।

তেরোটি গভীর ক্ষত নিয়ে একজন মানুষ আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসতে পারে—এ কথা কে বিশ্বাস করবে? এটি কোনো সাধারণ সাহস নয়। এটি বিশ্বাসের এমন এক প্রতিচ্ছবি যা শারীরিক সীমাবদ্ধতার সমস্ত দেয়াল ভেঙে দেয়। সানজারি’র যুদ্ধে মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) কেবল অস্ত্র দিয়েই লড়াই করেননি, বরং এক অদম্য ইচ্ছা নিয়ে লড়েছিলেন; এমন এক ইচ্ছা, যার মূল প্রোথিত ছিল এই গভীর বিশ্বাসে যে তাঁর পথটি সত্য ছিল। নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তিনি অন্যদের দেখিয়েছিলেন যে, জিহাদ কেবল বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি নিজের ভেতরের ভয় ও দুর্বলতার বিরুদ্ধেও এক মহাসংগ্রাম।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
«وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا» (العنکبوت: 69)
“যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ প্রদর্শন করব।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৬৯)

মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) ছিলেন এই আয়াতের অন্যতম স্পষ্ট জীবন্ত দৃষ্টান্ত। আমিরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ উমার (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে, আফগানিস্তান ইসলামী ইমারাত (আইইএ) খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ভেঙে পড়বে। কিন্তু সেই সংকটময় মুহূর্তে মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও দূরদর্শিতাকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন যা কেবল সেই ভাঙনকেই রোধ করেনি, বরং জিহাদকে এক নতুন রূপ ও শক্তি দান করেছিল। তিনি যুক্তি ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিভেদ ও বৈপরীত্যকে ঐক্যে রূপান্তর করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন প্রকৃত নেতা তিনিই, যিনি চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেও উম্মাহর জাহাজকে নিরাপদ তীরে নোঙর করাতে পারেন।

তিনি অসম যুদ্ধকে (Asymmetric warfare) একটি শিল্পে পরিণত করেছিলেন। সামরিক বিশ্লেষকরা হয়তো তাঁর রণকৌশলের ব্যাখ্যা দিতে পারেন, তবে তাঁর আসল প্রতিভা ছিল এই যে, তাঁর প্রতিটি অভিযানের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা থাকত। কুন্দুজ এবং হেলমান্দের অভিযানগুলো কেবল সামরিক আক্রমণ ছিল না। সেগুলো ছিল শত্রুর প্রতি এক ঘোষণা যে, মুজাহিদদের মনোবল কখনোই ভেঙে ফেলা যাবে না; আর মুজাহিদদের জন্য এক আশ্বাস যে, তাদের পথ সত্য এবং বিজয় সুনিশ্চিত।

তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেমন ন্যাটো (NATO) বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলত, তেমনি বিশ্বাসীদের অন্তরে এক নতুন সংকল্পের সঞ্চার করত। এটি তখন আর কেবল যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল প্রতিরোধের এক বিশুদ্ধতম ও সর্বোচ্চ শিল্প রূপ।

এবং অতঃপর, মার্কিন ড্রোন তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়। সেই অক্লান্ত মুজাহিদ, সেই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন। শত্রু ভেবেছিল তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে জিহাদের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তারা বুঝতে পারেনি তারা কাদের মুখোমুখি হয়েছে। শাহাদাত কোনো মুজাহিদের পথের শেষ নয়; এটি তো এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
«وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ» (آل عمران: 169)
“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছে।” (সূরা আল-ইমরান: ১৬৯)

নিজের শাহাদাতের মাধ্যমে মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) জিহাদের প্রকৃত অর্থের মাঝে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করে গেছেন। সেই চেতনা আজো প্রতিটি মুজাহিদের অন্তরে বেঁচে আছে, এবং কোনো ড্রোন বা কোনো বোমা তা কেড়ে নিতে পারবে না।

আজ তাঁর রেখে যাওয়া কীর্তির দিকে তাকালে যেন স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায় তাঁর সেই চিরচেনা কান্দাহারী টোনের কণ্ঠস্বর, যা বলছে: “আমার প্রতিটি ক্ষত ছিল আলোর পানে চেয়ে থাকা এক একটি জানালা, আর প্রতিটি আপাত পরাজয় ছিল চূড়ান্ত বিজয়ের অভিমুখে এক একটি ধাপ।”

তাই পরিশেষে একটি প্রশ্ন রাখতেই হয়। এই সমস্ত আত্মত্যাগ কিসের জন্য ছিল? এই সমস্ত সহনশীলতা কিসের জন্য ছিল? হয়তো এর উত্তর লুকিয়ে আছে কান্দাহারের পাহাড়গুলোর সেই গভীর ও প্রতিধ্বনিত নীরবতায়; সেই একই পাহাড়, যেখানে এই অবিস্মরণীয় নায়কের স্মৃতি এখনো ঘুরে বেড়ায় এবং ফিসফিস করে বলে: “জিহাদের কোনো শেষ নিঃশ্বাস নেই। এই পথ আলোর পথ, আর আলোর কখনো মৃত্যু হয় না।”

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَیْهِ رَاجِعُونَ
“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।”

Exit mobile version