মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর সব অর্জনের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে, তা হলো আমিরুল মুমিনীন হিসেবে তিনি আফগানিস্তান ইসলামী ইমারাতকে (আইইএ) এমন এক মুহূর্তে ধ্বংসের মুখ থেকে টেনে তুলেছিলেন, যখন আন্দোলনটির টিকে থাকা নিয়েই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল।
সেই সময়টি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইসলামী আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা আমিরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ উমার মুজাহিদ (রহ.)-এর ইন্তেকালের খবরটি জনসমক্ষে আসার আগে দীর্ঘ দুই বছর গোপন রাখা হয়েছিল। যখন এই খবরটি শেষ পর্যন্ত সামনে আসে, তখন তা আন্দোলনের সাংগঠনিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির মূলে এক তীব্র ঝাঁকুনি দেয়।
কিন্তু মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) সেই সংকটময় মুহূর্তটিকে ঈমানের স্পষ্টতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ইস্পাতকঠিন সংকল্প দিয়ে মোকাবেলা করেছিলেন। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং আন্দোলনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেন। শত্রু পক্ষ একে একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিল এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) শক্তি বা জোরজুলুমের মাধ্যমে এর জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিবর্তে, তিনি ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এবং আফগান উপজাতীয় ঐতিহ্যের ওপর ভরসা করে সংলাপ ও সমঝোতার পথ বেছে নেন। তিনি মানুষকে বলপ্রয়োগ করে নয়, বরং যুক্তিবোধ দিয়ে আবারও এক সুতায় বেঁধেছিলেন।
যখন তিনি ভেতর থেকে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করছিলেন, ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরেকটি হুমকি দানা বেঁধে উঠছিল। ইরাক ও সিরিয়া থেকে উত্থান ঘটা আইএসআইএস (আইএস) তখন আফগানিস্তানে পা রাখার চেষ্টা করছিল। তারা ইসলামী ইমারাতের অসন্তুষ্ট সদস্যদের নিজেদের দিকে টানতে শুরু করে এবং “উইলায়াত খোরাসান” নামে একটি সমান্তরাল নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চালায়। তাদের স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল আফগান জিহাদকে প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলে বিভক্ত করে ফেলা।
মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমাপিত কিন্তু দ্ব্যর্থহীন। তিনি একটি দৃঢ় ধর্মীয় ও কৌশলগত অবস্থান নেন, আফগানের মাটিতে জিহাদ ও শাসনের ব্যানারে দুটি সমান্তরাল গ্রুপ কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। তিনি মুজাহিদীনদের সংগঠিত করেন এবং পূর্ব আফগানিস্তানে, বিশেষ করে নানগারহার ও জাবুলে আইএস খারেজীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই অভিযানগুলো যখন শেষ হয়, ততক্ষণে আইএস এক কোণঠাসা ও প্রভাবহীন শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, আর ইসলামী আমিরাত মাঠের একমাত্র প্রধান সামরিক ও ধর্মীয় শক্তি হিসেবে টিকে ছিল।
এরপর এলো কুন্দুজ। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে, মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর সরাসরি নেতৃত্ব ও কৌশলগত নির্দেশনায় মুজাহিদীনরা এমন এক কাণ্ড করে বসলেন যা কাবুলের পুতুল সরকার এবং তাদের মার্কিন পৃষ্ঠপোষক—উভয়কেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তারা উত্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী কুন্দুজ দখল করে নেন। ২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর এটিই ছিল মুজাহিদীনদের হাতে নেওয়া প্রথম কোনো বড় শহর। সামরিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ইসলামী ইমারাত অবশ্য কয়েকদিন পরই সেখান থেকে পিছু হটে, কিন্তু ততক্ষণে আসল বার্তাটি দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। এই বিজয় মুজাহিদীন ও সাধারণ মানুষের মনোবল আকাশচুম্বী করে দেয় এবং মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর সামরিক প্রজ্ঞা নিয়ে আন্দোলনের ভেতরের সব সংশয় চিরতরে দূর করে দেয়।
তাঁর দূরদর্শিতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশ্বমঞ্চে ইসলামী ইমারাতকে শুধু একটি সামরিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি বৈধ রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি দোহার রাজনৈতিক কার্যালয়কে পুনর্গঠিত ও পুনরুজ্জীবিত করেন এবং রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সাথে আনুষ্ঠানিক ও সরাসরি সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই কূটনীতির ফল ছিল সুদূরপ্রসারী, এই বৈশ্বিক শক্তিগুলো ইসলামী আমিরাতকে কোনো অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে নয়, বরং অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম একটি দায়িত্বশীল পক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
তাঁর নেতৃত্বের সময়ে নীরবে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তিটিই ২০২১ সালে পূর্ণতা পায়, যখন আমেরিকার পরাজয় ও প্রত্যাহার ইসলামী ইমারাতের ঐতিহাসিক বিজয়ের পথ সুগম করে।
এই সংকটময় সময়ে মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)-এর ঈমানী দূরদর্শিতা এবং অনন্য সাহসিকতাই আফগান জিহাদকে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি থেকে রক্ষা করেছিল এবং আইএসের ফিতনায় টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল। তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার এটাই, তিনি পুরো আন্দোলনকে একটি ইস্পাতকঠিন দেয়ালের মতো ধরে রেখেছিলেন। আর সেই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
