পরিখার বীর, আন্তর্জাতিক রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র: শহীদ মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) ​

✍🏻 সাইফুদ্দিন

আফগানিস্তানের আধুনিক ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্ব খুব কমই এসেছেন, যিনি নিজের জীবনে একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং সত্যিকারের বিনয়, খোদাভীতি ও আন্তরিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ইসলামি ইমারাত আফগানিস্তানের (আইইএ) দ্বিতীয় আমির মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.) ছিলেন সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন। তাঁর নেতৃত্ব আইইএ-এর ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে টিকে থাকবে।

যখন নেতৃত্বের ভারী দায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পণ করা হয়, তখন ইসলামি ইমারাত তার ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল, সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের মুখোমুখি ছিল। কিন্তু তাঁর সুপরিমিত রাষ্ট্রনায়কোচিত দক্ষতা এবং জনগণের ও মুজাহিদীনদের প্রতি তাঁর গভীর ও অকৃত্রিম বিনয়ের মাধ্যমে তিনি এই তরীকে নিরাপদে তীরে ভিড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নেতাই দূর থেকে আদেশ জারি করেন; কিন্তু শহীদ মনসুর সাহেবের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, বিশাল রাজনৈতিক দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে যুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি।

মনসুর সাহেবের সময়ের বেশ কয়েকজন সঙ্গী এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সেই সময়ে হেলমান্দ, কুন্দুজ এবং অন্যান্য প্রদেশে যখন যুদ্ধ অত্যন্ত সংকটাপন্ন রূপ ধারণ করেছিল, তখন মুজাহিদীনদের মনোবল বাড়াতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রকে কাছ থেকে পরিচালনা করতে মনসুর সাহেব নিজেই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখভাগে ছুটে যেতেন।

এটি কোনো লোকদেখানো কাজ ছিল না। তিনি সাধারণ মুজাহিদীনদের সাথে ধূলিমলিন পরিখায় (ট্রেঞ্চে) বসতেন, তাদের সমস্যার কথা শুনতেন এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও শত্রুদের বড় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তা নস্যাৎ করে দিতেন। কুন্দুজের প্রথম পতন এবং হেলমান্দে মুজাহিদীনদের দ্রুত অগ্রগতি ছিল তাঁর এই সরাসরি ও সম্মুখ-নেতৃত্বেরই প্রত্যক্ষ ফলাফল।

তাঁর সময়কালটি ছিল অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের এক মহাসংকটকাল। তিনি এমন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার যেকোনো একটিই ইসলামি ইমারাতকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

প্রথমটি ছিল, আমিরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ উমারের (রহ.) শাহাদাতের খবর গোপন রাখা। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের পরামর্শ অনুযায়ী, মুজাহিদীনদের সারি সুসংহত ও শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত সেই খবর গোপন রাখা হয়েছিল, যা আইইএ-কে একটি মারাত্মক ও সম্ভাব্য ভাঙন থেকে রক্ষা করেছিল।

দ্বিতীয়টি ছিল, আইএস (দাঈশ) ফেতনাকে নস্যাৎ করা। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে, আইএস নামধারী গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানে শিকড় গাড়ার এবং মুজাহিদীনদের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। শহীদ মনসুর সাহেব অত্যন্ত দৃঢ়তা, সামরিক বিচক্ষণতা এবং দ্রুততার সাথে এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেন। এই হুমকিটি ডালপালা মেলার আগেই তিনি তা উপড়ে ফেলেন এবং মুখলিস (আন্তরিক) মুজাহিদীনদের নিরাপদে একটি বিপজ্জনক বিভক্তি থেকে রক্ষা করেন।

তৃতীয়টি ছিল, বিশ্বমঞ্চে আইইএ-এর রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। তিনি দোহা রাজনৈতিক কার্যালয়কে সক্রিয় করেন এবং প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে তিনি আইইএ-কে রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বের করে আনেন এবং এমন একটি আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও বৈধতা এনে দেন, যা বাইরের বিশ্ব আর উপেক্ষা করতে পারেনি।

হাজার হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার সেনাপতি হিসেবে অহংকার করাটা তাঁর জন্য সহজ, এমনকি স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু মনসুর সাহেব ছিলেন বিনয়ের এমন এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিস্মিত করত। বায়তুলমালের (সরকারি তহবিল) ব্যাপারে তিনি এতটাই সতর্ক ছিলেন যে, নিজের জন্য কোনো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা দাবি করেননি। বিভিন্ন সভা ও মজলিসে তিনি এমন সাধারণ ভঙ্গিতে বসতেন যে, নতুন কেউ এলে বুঝতেই পারতেন না যে—কে এই পুরো আন্দোলনের আমির!

মুজাহিদীনরা যখন তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেন, তখন তিনি মৃদু হেসে বলতেন:
“ইসলামি নেজাম (ব্যবস্থা) এবং মুজাহিদীনদের ঐক্যের তুলনায় আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই।”

এই আন্তরিকতা এবং খোদাভীতির কারণেই মুজাহিদীনরা তাঁকে সীমাহীন ভালোবাসতেন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সফর থেকে ফেরার পথে মার্কিন ড্রোন হামলায় শাহাদাতবরণ করেন মোল্লা আখতার মুহাম্মাদ মনসুর (রহ.)। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আইইএ-কে একটি ঐক্যবদ্ধ, সুসংহত এবং সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে রেখে গেছেন, যা পরবর্তীতে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও বিজয়ের মূল ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাঁর নেতৃত্ব একটি চিরন্তন সত্যকে প্রমাণ করেছে—একজন প্রকৃত নেতা তিনি নন, যিনি কেবল শান্ত সময়ে শাসন করেন। বরং প্রকৃত নেতা তিনিই, যিনি ঝড়ের মহাসংকটের মাঝেও নিজের জাতির জন্য মুক্তির পথ খুঁজে বের করেন।

Exit mobile version