দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াকে সংযুক্তকারী ভূখণ্ডে প্রচলিত কূটনীতি ক্রমাগত তার প্রভাব হারাচ্ছে। তার জায়গা দখল করেছে গোয়েন্দা ও ভূরাজনৈতিক দাবার এক জটিল খেলা, যেখানে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ঘুঁটিগুলো নিরন্তর পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। বহু বছর ধরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আফগানিস্তান থেকে কথিতভাবে পরিচালিত প্রতিটি সশস্ত্র তৎপরতার দায় আফগানিস্তানের ইসলামী ইমারতের ওপর চাপিয়ে এসেছে। কিন্তু ইসলামী ইমারতের নিজস্ব বয়ান এখন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তারা আর কেবল অস্বীকার কিংবা পাল্টা অভিযোগের ওপর নির্ভর করছে না; বরং মাঠপর্যায়ের তথ্যপ্রমাণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো কাবুলের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী বয়ান, যা রাওয়ালপিন্ডির দীর্ঘদিনের অবস্থানকে এক গুরুতর কৌশলগত অচলাবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে দাবি করে এসেছে যে, টিটিপি এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী আফগানিস্তানে অবস্থান করে সেখান থেকেই হামলা চালায়। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ইসলামী ইমারতকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে বের করে এনে আরও সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ বয়ান উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে।
কাবুল এখন আর শুধু এই দাবি করে না যে আফগান ভূমি কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে না। বরং তারা বলছে, অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হুমকি দাঈশ খোরাসানের প্রধান ঘাঁটি আফগানিস্তানে নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই অবস্থিত এবং এর বিস্তারের পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ উপাদান সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও আর একে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছে না। ধারাবাহিক নিরাপত্তা-ঘটনা এবং উদ্ভূত তথ্যপ্রমাণ এই দাবিকে বাস্তব গুরুত্ব প্রদান করেছে।
২০২৫ সালের ১৬ মে পাকিস্তানের অভ্যন্তর থেকে দাঈশের গণমাধ্যম মুখপাত্র আজিজ আযযামের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর, এবং একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর তুরস্কের এমআইটির গোপন অভিযানে মুহাম্মদ গোরান নামে পরিচিত একাধিক জ্যেষ্ঠ দাঈশ কমান্ডারের আটক হওয়ার সংবাদ সামনে আসার পর, কাবুলের দাবিগুলো এমন এক নথিভিত্তিক ভিত্তি লাভ করে, যা সহজে অস্বীকার করা কঠিন।
এরপর ইসলামাবাদে জুমার নামাজের সময় একটি শিয়া ইবাদতকেন্দ্রে দাঈশের আত্মঘাতী হামলা এবং বিশিষ্ট আলেম মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিসের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়, দাঈশ আর কেবল দুর্গম উপজাতীয় পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। পাকিস্তানের শহর ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতেও তাদের সক্রিয় লজিস্টিক ও অপারেশনাল নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ইচ্ছা করলেই হামলা চালাতে সক্ষম।
এই সমীকরণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও জটিল দিক হলো, যাকে ‘সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ফাঁদ’ বলা যেতে পারে। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ডুরান্ড লাইনের বরাবর বেড়া নির্মাণ, ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন এবং হাজার হাজার সেনা মোতায়েনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাই এখন পাকিস্তানের প্রচলিত বয়ানের জন্য একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি করেছে।
যদি পাকিস্তানের দাবি সত্য হয় যে দাঈশ এখনও আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছে এবং এত বড় পরিসরে হামলা চালাতে সক্ষম, তাহলে সেই সীমান্ত বেড়া, নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিপুল নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এতসব ব্যবস্থার পরও যদি দাঈশ সদস্যরা ডুরান্ড লাইন অতিক্রম করতে পারে, তবে তা হয় ভয়াবহ নিরাপত্তা ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়, নয়তো আরও উদ্বেগজনক কিছু নির্দেশ করে যে, গোয়েন্দা পরিবেশের কিছু ফাঁক ইচ্ছাকৃতভাবে খোলা রাখা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে টিকিয়ে রাখার জন্য।
অন্যদিকে, যদি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দাবি করে যে তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ কার্যকর ও সুরক্ষিত, তাহলে ইসলামী ইমারতের বক্তব্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে—দাঈশের বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থিক ও কার্যকরী ভিত্তি পাকিস্তানের ভেতরেই অবস্থিত, বিশেষত খাইবার পাখতুনখোয়ার উপজাতীয় জেলা এবং বেলুচিস্তানের কিছু অংশে। সেক্ষেত্রে দাঈশের আফগানিস্তান থেকে আসার কোনো প্রয়োজনই নেই; বরং পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় সামরিক কাঠামোর ভেতরের কিছু উপাদান ভূমিকা রেখেছে।
বেইজিং ও মস্কো এই বয়ানগত সংঘাত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের জন্য এটি কোনো বিমূর্ত উদ্বেগ নয়। সিপিইসি এবং আফগানিস্তানে তাদের বৃহৎ খনিজ বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকৃত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। যখন কাবুল দেখাতে সক্ষম হয় যে তারা নিজেদের ভূখণ্ডে দাঈশ নেটওয়ার্ককে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা-শূন্যতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তখন বেইজিংয়ের কাছে একটি সরল উপসংহার স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ডুরান্ড লাইনের ওপারে আঙুল তোলার পরিবর্তে পাকিস্তানের উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ দেওয়া।
পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা-বয়ান এখন এক সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যদি তারা জোর দিয়ে বলে যে দাঈশ আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হচ্ছে, তবে তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আসলে কী অর্জন করেছে। আর যদি তারা পাকিস্তানের ভেতরে দাঈশের উপস্থিতি স্বীকার করে, তাহলে সেটি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার আংশিক স্বীকারোক্তির সমতুল্য হবে।
দাঈশ এখন পাকিস্তানের জন্য এমন এক সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যাকে তারা পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারছে না, আবার সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দায় হিসেবেও স্বীকার করতে পারছে না। আর এই সংকট ক্রমেই আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশে যা ঘটছে, তা অনেক আগেই সীমান্তসংঘর্ষ ও পারস্পরিক দোষারোপের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। এটি এখন প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ানের এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আর এই পুরো পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব কর্মকাণ্ড। আফগানিস্তানের ভেতরে ইসলামী ইমারত যখন দাঈশকে পরাজিত করে, তখন পাকিস্তান অবশিষ্ট উপাদানগুলোকে আশ্রয় দেয় এবং পুনরায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাসের নিজস্ব বিচার রয়েছে। ইসলামী ইমারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে ঘুঁটি লালন-পালন করেছিল, সেটিই আজ তাদের নিজেদের গলায় ফাঁস হয়ে ফিরে এসেছে।




















