পাঁচ বছর আগে, যখন এই ভূখণ্ড আবারও স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করেছিল; তখন প্রায় বিশ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল—যে দীর্ঘ সময়ে সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছিল, মায়েরা সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর হয়েছিল, বাবারা তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছিলেন, কুরআন পোড়ানো হয়েছিল, মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল এবং হাফিজগণ শাহাদাতবরণ করেছিলেন। মুসলমানদের আহত, বন্দি ও হত্যা করা হয়েছিল। এমন এক সময় ছিল, যখন সত্য কথা বলা ছিল অপরাধ; ভয় ও আতঙ্কের ছায়ায় আজানের ধ্বনি শোনা যেত; পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করাও একজন মানুষের জীবনের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারত; আর মসজিদের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গেই মৃত্যুর আশঙ্কা জড়িয়ে থাকত।
এমনও রাত গেছে, যখন মায়েরা সকাল পর্যন্ত জেগে থাকতেন সন্তানের পদধ্বনি শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু ঘরে ফেরার সেই পদধ্বনির পরিবর্তে তাঁদের কানে পৌঁছাত সন্তানের শাহাদাতের সংবাদ। এমন বাবাও ছিলেন, যারা সন্তানদের জানাজা ও দাফনের অপেক্ষায় ছিলেন; অথচ কারও কারও সেই অপেক্ষার যেন আজও অবসান হয়নি।
এমন পরিবারও ছিল, যেখানে কোনো ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী হামলার পর পরিবারের সদস্যরা চিরতরে হারিয়ে গেছেন; কোনো কোনো ঘর তো একেবারেই জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।
বহু বছর আগে আমেরিকা ও তার মিত্ররা যেন বিবেচনাবোধ হারিয়ে ফেলেছিল। তারা আর বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। শেষ পর্যন্ত তারা আফগান ভূমি, নিপীড়িত আফগান জনগণ এবং একটি সুদৃঢ় ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার ওপর হামলা চালায়। যুদ্ধ ও কূটনীতির নীতিমালা লঙ্ঘন করে তারা এমন সব জুলুম ও অবিচার সংঘটিত করেছিল, যার নজির কিয়ামত পর্যন্ত অতিক্রম করা কঠিন হবে।
তারা কোনো কোনো আফগানকে ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে আহত করেছে, কাউকে বন্দি করেছে এবং অনেককে নানাবিধ নির্যাতনের শিকার করেছে। তারা ঘরবাড়ি, মাদরাসা, মসজিদ ও জনসাধারণের স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে। আলেম, হাফিজ ও গোত্রীয় প্রবীণদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপবাদ আরোপ করেছে।
কিন্তু আফগানরা এমন জাতি নয়, যারা দখলদারিত্বের ছায়ায় শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকবে। অতীতেও তারা এমন ছিল না, ভবিষ্যতেও হতে পারে না। আফগানদের ইতিহাস দখলদারদের পরাজিত করার গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে পরিপূর্ণ। তারা ব্রিটিশ ও রুশদের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্যেরও শিং ভেঙে দিয়েছিল এমনভাবে যে, তারা এখনো সেই ক্ষত চাটছে। আর তাদের সন্তানরা যদি কখনো ফিরে আসার কথা ভাবে, তারা তাদের ফিরে না আসার পরামর্শ দেবে।
একসময় এমনও ছিল, যখন তালেবানদের নিজেদের ভূমিতে বসবাসের অধিকারটুকুও দেওয়া হয়নি। তাদের হয় বন্দি করা হতো, নয়তো হত্যা করা হতো।
তালেবানরাই ছিল সেই মানুষ, যারা গ্রামের সরল ভাষায় B-52, ক্রুজ মিসাইল, ব্ল্যাক হক, ড্রোন, ট্যাংক, নানা ধরনের অস্ত্র, দেড় লাখ সৈন্য এবং বিপুলসংখ্যক দেশীয় পুতুল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র মুষ্টিমেয় গুলি নিয়ে ঢালের মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
তালেবানরা শহরের সুউচ্চ ভবন, সুন্দর উদ্যান, বিলাসবহুল গাড়ি ও আরামদায়ক বিছানা পেছনে ফেলে এসেছিল। তারা মা-বাবার উষ্ণ স্নেহের আলিঙ্গন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছিল এবং ছোট সন্তানদের ভালোবাসা থেকেও বঞ্চিত করেছিল। তারা আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস ও সহজ জীবন ছেড়ে পাহাড়ের পথে পা বাড়িয়েছিল। উত্তপ্ত ও কঠিন পাথরের ওপর পিঠ ঠেকিয়ে তারা এক মহা-অজগরকে পরাস্ত করার চিন্তায় মগ্ন হয়েছিল।
সেই সময় তালেবানদের কাছে কোনো ট্যাংক ছিল না, বিমান ছিল না, আধুনিক বিলাসবহুল যানবাহন ছিল না, সাঁজোয়া গাড়ি ছিল না, ছিল না লেজার অস্ত্র। তাদের ছিল শুধু খালিদ ও উমরের দৃঢ় সংকল্প এবং আল্লাহর সাহায্য। এই দুটিকেই অবলম্বন করে তারা সেই প্রবল ঢেউকেও প্রতিহত করেছিল। এমন সব কাজ তারা করে দেখিয়েছিল, যার ফলে দখলদারদের সামনে দেশ ছেড়ে পলায়ন ও পশ্চাদপসরণ ছাড়া আর কোনো পথ অবশিষ্ট ছিল না।
এরপর আমেরিকা শক্তি প্রয়োগের পথ থেকে সরে গিয়ে তার কূটকৌশলী রাজনৈতিক খেলায় অবতীর্ণ হয়। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের পরাজয়কে আড়াল করতে চেয়েছিল। পূর্ণ আঠারো মাস তারা এ প্রচেষ্টায় নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল। কিন্তু এখানেও তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল মুহাম্মদ ﷺ-এর অনুসারীদের সঙ্গে। দোহা চুক্তির মাধ্যমে তারা কেবল এমন চৌদ্দ মাসের একটি সময় নিশ্চিত করতে পেরেছিল, যখন তাদের ওপর আর হামলা করা হবে না। শেষ পর্যন্ত তারা নীরবে নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার পথ ধরেছিল। এটি তাদের কোনো অর্জন ছিল না; বরং ছিল বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ খুঁজে নেওয়া মাত্র।
কিন্তু এই ভূখণ্ড মরে যায়নি। এই জাতি ভেঙে পড়েনি। সত্যের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়নি। প্রতিটি রক্তবিন্দু থেকে নতুন সংকল্পের জন্ম হয়েছে। প্রতিটি আত্মত্যাগ থেকে স্বাধীনতার নতুন প্রত্যয় জন্ম নিয়েছে। আর প্রতিটি অন্ধকারের পর আগামী দিনের আলোর প্রত্যাশা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অবশেষে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অগণিত শাহাদাতের পর সেই দিনটি এসেছিল, যেদিন মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরবের এক ঝলক আবারও ফিরে এসেছিল। সেই দিন, যেদিন এই ভূখণ্ডের কপালে আবারও স্বাধীনতার চিহ্ন দীপ্ত হয়ে উঠেছিল এবং মানুষ অনুভব করেছিল তাদের আত্মত্যাগের রক্ত বৃথা যায়নি।
সেটি ছিল সেই মায়েদের ধৈর্যের বিজয়ের দিন, যারা নিজেদের সন্তানদের আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছিলেন। সেটি ছিল সেই বাবাদের অশ্রুর প্রতিদানের দিন, যারা তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছিলেন। সেটি ছিল সেই হাফিজ, আলেম ও মুমিনদের আত্মত্যাগের সুফল লাভের দিন, যারা সত্যের জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
এই দিনটিকে শুধু একটি তারিখ কিংবা প্রতীকী দিবস হিসেবে সংরক্ষণ করা উচিত নয়। ইতিহাসের স্মৃতিতে, মানুষের হৃদয়ে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা ও বিশ্বাসে এই দিনকে চিরজীবন্ত করে রাখতে হবে।
যেসব জাতি নিজেদের শহীদদের আত্মত্যাগ ভুলে যায় না, পূর্ববর্তী প্রজন্মের বেদনা উপলব্ধি করে এবং শান্তি, জ্ঞান, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার ভিত্তির ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে, তারাই নিজেদের ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। যাতে আর কোনো মাকে নিজের সন্তানের হারানোর বেদনায় অশ্রু বিসর্জন দিতে না হয়।
২৪ আসাদ সেই ঐতিহাসিক দিন, যেদিন উমরের বাহিনীর পদচারণায় আর্গ সম্মানিত হয়েছিল; যেদিন কুফর ও তার মিত্রবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল; আর যেদিন বীর আফগান জনগণ অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।





















