সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বারবার প্রমাণ করেছে, তারা নিজেদের জনগণের কাছে সত্যনিষ্ঠতার মাধ্যমে নয়, বরং তথ্য গোপন, বিভাজন সৃষ্টি এবং কাল্পনিক শত্রু দাঁড় করানোর মাধ্যমে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চায়। বর্তমানে এই শাসকগোষ্ঠী যখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের এক গভীর ঘূর্ণাবর্তে নিমজ্জিত, তখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে পাকিস্তানি জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে আবারও উত্তরের প্রতিবেশী আফগানিস্তানের দিকে আঙুল তুলছে। এই পুরোনো ও জীর্ণ কৌশল এখন আর বিশ্বজনমতকে তো দূরের কথা, পাকিস্তানের জনগণকেও বিভ্রান্ত করতে পারছে না। কারণ তারা ইতোমধ্যেই বেশ ভালোভাবে বুঝে গেছে, এই পুরো নাটকের নেপথ্যের কারিগর তারাই, যারা ইসলামাবাদের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর বদ্ধ দরজার আড়ালে বসে আছে।
এই নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বড় ধরনের নিরাপত্তাগত ব্যর্থতাগুলো আড়াল করা। বিস্ফোরণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা এবং খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা এই দেশের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা ও অদক্ষতার স্পষ্ট প্রমাণ। এসব ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা আফগানিস্তানের ওপর দায় চাপানো, জনমতকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া এবং নিজেদের দায়ভার থেকে মুক্ত থাকার পথ বেছে নেয়।
এর পাশাপাশি, পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও দ্বিমুখী ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখিয়েছে। বাস্তবে মিত্রের প্রতিরক্ষায় তারা কোনো কার্যকর সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এর আগে ঘোষণা করেছিলেন, ‘সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার নিঃশর্ত এবং এর শেষ সীমা পর্যন্ত আমরা এগিয়ে যাব।’ তারপরও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার থেকে সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের দূরে রেখেছেন। মাঠের বাস্তবতায় ইসলামাবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, রিয়াদের সঙ্গে নিজেদের প্রকাশ্য ও লিখিত অঙ্গীকারও তারা বাস্তবায়ন করতে চায় না। বরং আফগানিস্তানে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়ে নিজেদের ব্যস্ত দেখিয়ে রিয়াদের প্রতি দায়িত্ব থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে, ইসলামী ইমারত বরাবরই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকে শুরু করে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার রোধ করা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপই কাবুলের সদিচ্ছার প্রমাণ। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এসব পদক্ষেপকে শুধু উপেক্ষাই করেনি, বরং দাঈশসহ অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি তাদের প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদেরই এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার উৎসে পরিণত করেছে। পাকিস্তানের কিছু মহলের সহযোগিতায় পরিকল্পিত অশুভ ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের সেই প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর একই পরিকল্পনাকারীরা আবারও সরাসরি হামলা পরিচালনায় নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বিপজ্জনক যে পরিস্থিতির আশঙ্কা সামনে রয়েছে, তা হলো আইএসআই ইসলামাবাদের বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নিজেরাই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে অথবা ড্রোন হামলার ব্যবস্থা করে এর দায় আফগানিস্তানের ওপর চাপাতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা এবং নিজেদের ব্যর্থতার পক্ষে অজুহাত তৈরি করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এসব শয়তানি ষড়যন্ত্র এই শাসকগোষ্ঠীর হতাশা ও অসহায়ত্বের গভীরতাই প্রকাশ করে। তবে স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া উচিত, এ ধরনের নোংরা খেলার সময় শেষ হয়ে এসেছে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এখন আর আঞ্চলিক জনমতকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে না।
এ কথা স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন যে, আজকের আফগানিস্তান গতকালের আফগানিস্তান নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামী ইমারতের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের যেকোনো স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, সামরিক অবকাঠামো, উন্নত সামরিক সরঞ্জাম এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ইতোমধ্যেই আফগান বাহিনীর হাতে রয়েছে। সঠিক সময় ও সুযোগে আফগান বিমানবাহিনী এসব স্থাপনায় আঘাত হানবে। এটি একটি বাস্তব হুমকি এবং পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর জানা উচিত, তাদের অপরাধের জন্য তাদের কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্য ও ন্যায়ের সামনে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারেনি। পাকিস্তানের জনগণ নিজেরাই তাদের সেনাবাহিনীর ধ্বংসাত্মক নীতির শিকার। এমন একটি দিন আসবে, যখন আফগান ও পাকিস্তানের জনগণ উভয়েই এসব অপরাধের হিসাব নেবে। ভুল হিসাবের মূল্য দিতে হবে চড়া দামে এবং এই শাসকগোষ্ঠীকে একসময় না একসময় তাদের সব ভুলের মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
আজ পাকিস্তান যে সংকটের ঘূর্ণাবর্তে নিজেই নিমজ্জিত হয়েছে, তার পেছনে বিদেশি শত্রুদের কোনো ষড়যন্ত্রই মূল কারণ নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত, পরস্পরবিরোধী নীতি এবং এমন সব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া, যারা একসময় অন্যদের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এখন তারাই উল্টো নিজেদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসবাদের প্রতি প্রকাশ্য ও গোপন সমর্থন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বারবার লঙ্ঘন এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান নিজের বিচ্ছিন্নতার ভিত্তি নিজেই তৈরি করেছে।
শান্তি ও সহযোগিতার পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে তা দুর্বল অবস্থান থেকে কিংবা দ্বিমুখী নীতি অব্যাহত রেখে সম্ভব নয়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যদি সত্যিই নিজেদের এবং গোটা অঞ্চলের জন্য দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা চায়, তাহলে তাদের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ করতে হবে, নিজেদের অঙ্গীকার পূরণ করতে হবে এবং আফগানিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায় আজ ইসলামাবাদের ওপর যে অন্ধকার ছায়া নেমে এসেছে, তা খুব বেশি সময়ের মধ্যে এক ভয়াবহ ঝড়ে পরিণত হতে পারে।





















