ইসলামী সভ্যতার বিকাশের ইতিহাস ও পর্যায়সমূহ
১. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ
মক্কায় আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর নবুওয়াতের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও চরিত্রের জগতে এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ইসলামী সভ্যতা হঠাৎ করে অস্তিত্ব লাভ করেনি। বরং আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর দাওয়াতের মাধ্যমে এর সূচনা হয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা বিস্তৃতি লাভ করে।
খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে আল্লাহর রাসুল ﷺ-এর নবুওয়াতের পূর্বে মানুষ তার স্রষ্টার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। জ্ঞান, হেদায়াত এবং সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য করার আলো ছাড়াই তারা জীবনযাপন করত। আখিরাতের জন্য কী আমল করা উচিত, সে বিষয়ে তাদের কোনো মনোযোগ ছিল না। বরং তারা সবসময় সামষ্টিক কল্যাণের ওপর নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিত।
এসব অনাচার সমাজকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে, জুলুম, অপরাধ, আগ্রাসন, অপমান, নির্যাতন, নিপীড়ন, লুণ্ঠন, অশ্লীলতার বিস্তার ও বৈষম্য বিশ্বব্যাপী জাহেলি সভ্যতার ভিত্তিতে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে মানবতা আত্মধ্বংস এবং ক্ষমতার পেছনে ছুটতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, এসব সমস্যা ও ভয়াবহ পরিস্থিতি মানবসভ্যতার ভিত্তিকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর নির্যাতন চালাত, ক্ষমতাবানরা অসহায়দের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করত এবং বিত্তশালীরা দরিদ্রদের ধ্বংস করত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
﴿وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَىٰ دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ﴾
[সূরা আস-সাজদাহ: ২১]
“আর অবশ্যই আমি তাদেরকে বড় শাস্তির পূর্বে নিকটবর্তী শাস্তির কিছুটা আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।”
সামগ্রিকভাবে তৎকালীন বিশ্বের অবস্থা এবং বিশেষ করে আরব উপদ্বীপের পরিস্থিতি একটি উজ্জ্বল ও সুন্দর ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো আশার আলোই দেখাচ্ছিল না। এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, যেখানে সাধারণ মানুষ, সমাজ ও জাতিগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারত না। কাঙ্ক্ষিত ও উজ্জ্বল আগামী দিনের আশায় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য তারা নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে পারত না।
তারা সব ধরনের দুশ্চিন্তা, ভয় ও হতাশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বস্তির সঙ্গে জীবন উপভোগ করতে পারত না। নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো ধরনের প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম থেকেও তারা বিরত থাকতে পারত না।
অন্যদিকে, কামনা-বাসনা ও সম্পদের বেদিতে আধ্যাত্মিকতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। মানুষ প্রতিদিন নৈতিক গুণাবলিকে পদদলিত করে তার পরিবর্তে অনৈতিকতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সমাজে নৈতিকতার মূল্যও হারিয়ে গিয়েছিল। দুর্নীতি ও নৈতিক অধঃপতন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মানুষের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছিল এবং পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
এ কারণেই আরব উপদ্বীপের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এমন এক নবীর আবির্ভাবের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, যিনি নবুওয়াতের মাধ্যমে সমাজের ভেঙে পড়া মূল্যবোধের ওপর আরোগ্যের প্রলেপ দেবেন, মানবজীবনের গতিপথকে সুশৃঙ্খল করবেন এবং ঐশী বিধানের ভিত্তিতে তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন। তিনি মানবতাকে এই সংকট থেকে বের করে আনবেন, জাতিকে অতুলনীয় অধঃপতন থেকে উদ্ধার করবেন এবং মানবতার ওপর আল্লাহর হুজ্জত পূর্ণ করবেন।





















