পাকিস্তানি সামরিক রেজিম আবারও নিরপরাধ আফগান নারী ও শিশুদের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করেছে। বিশ্ব যখন গাজায় জায়নবাদী রেজিমের অপরাধযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছে, তখন পাকিস্তানও সেই একই বর্বর পন্থা অসহায় আফগানদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে এবং মানবিক আইনের প্রতি একই ধরনের অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে। মনে হচ্ছে, ইসরায়েলের পদাঙ্ক অনুসরণ করা ছাড়া আর কিছু না করার শপথই যেন তারা নিয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলায় পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে কুনারের শুলতান জেলা ও হেলমান্দের গার্মসির জেলার আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে। ইসলামী ইমারতের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ নয়জন বেসামরিক নাগরিক শাহাদাতবরণ করেছেন, আরও ১১ জন আহত হয়েছেন এবং তিনটি আবাসিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এই সংখ্যাগুলোর আড়ালে রয়েছে অসংখ্য মানুষ, যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চলে বসবাস করা।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় নির্লজ্জভাবে দাবি করেছে, তারা সন্ত্রাসীদের আস্তানায় হামলা চালিয়ে ২২ জনকে হত্যা করেছে। কিন্তু তারা কোন সন্ত্রাসী? আর কোন আস্তানা? মুহাম্মদ হাবিব নামে ৩২ বছর বয়সী স্থানীয় এক বাসিন্দা, যিনি এই হামলার শিকার হয়েছেন, ছিলেন একজন দরিদ্র ও নিরীহ মানুষ। জীবিকা নির্বাহ করতেন পশু চরিয়ে। প্রতিদিন সকালে তিনি ছাগলগুলো নিয়ে চারণভূমিতে যেতেন এবং সন্ধ্যায় সেগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এই দরিদ্র রাখালের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। তার একমাত্র অপরাধ ছিল এমন একটি বাড়িতে বসবাস করা, যেটিকে পাকিস্তানি রেজিম নিজেদের ইচ্ছেমতো ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা’ বলে অভিহিত করেছে।
সাম্প্রতিক এসব হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে কুনার, পাক্তিকা, পাক্তিয়া, খোস্ত ও নানগারহার প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা বারবার পাকিস্তানি বিমান ও গোলন্দাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইউএনএএমএ নিশ্চিত করেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত অন্তত ১৮৫ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। বারবার সংঘটিত এসব হামলা স্পষ্ট করে যে পাকিস্তানের বিরোধ ও নিরাপত্তাগত হিসাব-নিকাশের মূল্য দিতে হচ্ছে আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষকে।
পাকিস্তানি রেজিমও গাজায় ইসরায়েল যে কৌশল অনুসরণ করে, সেই একই ছক অনুসরণ করছে। প্রথমে কোনো এলাকায় বোমাবর্ষণ করা, এরপর নির্লজ্জভাবে দাবি করা যে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে সেখানে পড়ে থাকে শিশুদের লাশ এবং ধ্বংস হয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ি। জায়নবাদী রেজিমও বারবার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অজুহাতে নিজেদের হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার বাস্তব পরিণতি হয়েছে আবাসিক এলাকা ধ্বংস এবং বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশুর মৃত্যু। এখন পাকিস্তানও একই পথে হাঁটছে। এ কারণেই মানুষ এই আচরণকে ইসরায়েলের ‘এশীয় সংস্করণ’ হিসেবে অভিহিত করছে, যেখানে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক ঋণের ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে টিকে আছে, আর তাদের সেনাবাহিনী নিজেদের রাজধানীর নিরাপত্তাও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারছে না। এমন আচরণই সাধারণত সেই রেজিমের বৈশিষ্ট্য, যে নিজের পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে যেকোনো ধরনের অপরাধের পথ বেছে নেয়। ইসলামী ইমারত বারবার স্পষ্ট করেছে যে আফগান ভূখণ্ড কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার কোনো লঙ্ঘনও মেনে নেওয়া হবে না। এ ধরনের আগ্রাসনের জবাব হতে হবে সুচিন্তিত, দৃঢ় এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। আফগানদের রক্ত মূল্যহীন নয় এবং সামরিক দাবির আড়ালে বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংসের ঘটনা গোপন করা যাবে না। যে রেজিম শিশুদের রক্তের ওপর টিকে থাকার চেষ্টা করে, শেষ পর্যন্ত সেই রক্তের স্রোতেই তাকে ডুবে যেতে হয়। ইসরায়েলের অপরাধের যে উত্তরাধিকার পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছে, একদিন সেই একই উত্তরাধিকার এই রেজিমকেও তার নিজের জামার আঁচল ধরে টেনে ধরবে।





















