মানবমনস্তত্ত্বের স্বীকৃত নীতিগুলোর একটি হলো, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা বা ব্যর্থতাকে মেনে নিতে কিংবা সহ্য করতে পারে না, তখন সে তার ক্রোধ ও হতাশা এমন কারও ওপর নিক্ষেপ করে, যাকে সে প্রতিরোধে অক্ষম মনে করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে Displacement বলা হয়। সাধারণ ভাষায় একে বলা হয়, “রাগ ঝাড়া দুর্বলের ওপর”। যেমন, কর্মস্থলে বসের অপমানের শিকার হওয়া একজন কর্মচারী ঘরে ফিরে নিরপরাধ সন্তানদের ওপর সেই ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে।
বিপর্যয় শুরু হয় তখন, যখন এই একই মানসিক প্রবণতা কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো এবং পররাষ্ট্রনীতির অংশে পরিণত হয়। তখন এটি আর কেবল একটি নৈতিক ব্যর্থতা থাকে না; বরং একটি কৌশলগত সংকটে রূপ নেয়, যা সীমান্ত অতিক্রম করে পুরো অঞ্চলকে তার পরিণতির মধ্যে টেনে আনে। আজ পাকিস্তানের সামরিক বয়ান এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি তার আচরণ এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বৈপরীত্যের একটি সুস্পষ্ট এবং উদ্বেগজনক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করাচির কেন্দ্রস্থলে রেঞ্জার্স সদর দপ্তরে জামাতুল আহরার (JuA)-এর দাবিকৃত হামলা এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এই বৈপরীত্যকে পূর্ণরূপে উন্মোচিত করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র সাত থেকে নয়জন হামলাকারী ওই কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। স্বাধীন সূত্রগুলোর দাবি, এতে চব্বিশেরও বেশি রেঞ্জার্স সদস্য নিহত হয়েছে।
যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগবে, এই হামলাকারীরা কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছল?
নিজেদের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া এই গোয়েন্দা ব্যর্থতার তদন্ত করার পরিবর্তে পাকিস্তানের সরকার ও সামরিক বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন একটি বয়ান হাজির করে, যেখানে বলা হয় হামলাকারীদের একজন আফগান নাগরিক, যে কয়েক দিন আগেই ডুরান্ড লাইন অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল। এমনকি সামরিক বাহিনী আটক ব্যক্তির একটি ভিডিওও প্রকাশ করে। কিন্তু সেখান থেকেই এই গল্পের প্রথম ভাঙন শুরু হয়।
ওই ব্যক্তির উচ্চারণ, কথাবার্তার ধরণ এবং ভাষাগত বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছিল যে তিনি পেশোয়ার ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পশতু ভাষাভাষী, আফগানিস্তানে প্রচলিত কোনো উপভাষার নন। এই একটি বৈপরীত্যই যথেষ্ট ছিল বোঝার জন্য যে সামরিক বাহিনীর বয়ান তথ্যের ভিত্তিতে নির্মিত হয়নি; বরং পূর্বনির্ধারিত কৌশলগত উদ্দেশ্যের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো পাকিস্তানের গোয়েন্দা ব্যবস্থার অত্যন্ত বাছাই করা দক্ষতা।
একদিকে পাকিস্তান দাবি করে যে তারা চিত্রাল থেকে কান্দাহার পর্যন্ত সমগ্র সীমান্তজুড়ে বিলিয়ন বিলিয়ন রুপি ব্যয় করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে, বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা স্থাপন করেছে এবং আধুনিক তাপীয় নজরদারি প্রযুক্তি মোতায়েন করেছে। কিন্তু তারপরও সশস্ত্র ব্যক্তিরা নাকি বাজাউর থেকে খাইবার পাখতুনখোয়া, পাঞ্জাব কিংবা বেলুচিস্তান পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ অস্ত্রসহ অতিক্রম করে ফেলছে, আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার কিছুই জানতে পারছে না।
অথচ করাচিতে কোনো হামলা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই সেই একই গোয়েন্দা ব্যবস্থা যেন হঠাৎ জেগে ওঠে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা হামলাকারীদের উৎস শনাক্ত করার দাবি করে এবং রাত শেষ হওয়ার আগেই কুনার, পাকতিয়া ও পাকতিকা প্রদেশে কথিত লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়।
এখানে সুস্পষ্ট প্রশ্ন হলো, যে গোয়েন্দা ব্যবস্থা নিজের দেশের ভেতরে দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শনাক্ত করতে পারে না, সে কীভাবে হঠাৎ অন্য একটি দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এত নিখুঁত ও কার্যকর হয়ে ওঠে?
এই বৈপরীত্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়, এসব হামলা কোনো আকস্মিক গোয়েন্দা সাফল্যের ফল ছিল না; বরং নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করা, জনরোষকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া এবং দায় একটি প্রতিবেশী দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল।
এই পুরো ঘটনায় পাকিস্তানের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এবং কিছু স্বঘোষিত থিংক-ট্যাংকও তাদের পরিচিত ভূমিকাই পালন করেছে। তারা সামরিক বাহিনীর বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে পুনরাবৃত্তি করেছে এবং আফগানিস্তানবিরোধী একটি কৃত্রিম সংঘাতময় পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যাতায়াতপথের নজরদারি কিংবা গোয়েন্দা সমন্বয় নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলার সাহস কেউ দেখায়নি। আর যারা এসব প্রশ্ন তোলে, তাদের হয় রাষ্ট্রদ্রোহী, নয়তো সন্ত্রাসবাদের সমর্থক আখ্যা দেওয়া হয়; অন্যথায় তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের আচরণের আরেকটি গভীর বৈপরীত্য শক্তির ভারসাম্যহীনতার মধ্যে নিহিত। পাকিস্তান বারবার দাবি করে যে বেলুচিস্তানে বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) কর্মকাণ্ডের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে এবং তাদের নেতারা ইরানের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ভারত কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে তারা কখনোই সেই ধরনের বিমান হামলা চালানোর সাহস দেখায় না, যা তারা নিয়মিতভাবে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পরিচালনা করে। কারণটি সুস্পষ্ট—প্রতিরোধক্ষমতার ভারসাম্য।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী খুব ভালো করেই জানে যে ভারত ও ইরান উভয়েরই আধুনিক বিমানবাহিনী এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে; এবং তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার তাৎক্ষণিক ও ব্যয়বহুল জবাব আসবে। বিপরীতে, বর্তমান আফগানিস্তানের কাছে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা যুদ্ধবিমান নেই। আর এ কারণেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখানে সিংহের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার অনুরূপ পদ্ধতিতে বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়িতে বোমাবর্ষণ করে।
বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় প্রায় প্রতিটি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারবঞ্চনা এবং গুমের সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের জনগণের দিকেই অস্ত্র তাক করে, তখন প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
যদি সত্যিই এসব সমস্যার সমাধানের সদিচ্ছা থাকত, তবে তার পথ হতো রাজনৈতিক সংলাপ, উন্নয়ন এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা; যাতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র পরিত্যাগ করে জাতীয় প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু তা ঘটছে না। কারণ সামরিক বাহিনী এখন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখে না; বরং এটি একটি ‘যুদ্ধ-অর্থনীতি’তে পরিণত হয়েছে। যতদিন বাস্তব কিংবা কল্পিত কোনো হুমকি বিদ্যমান থাকবে, ততদিন বৃহত্তর প্রতিরক্ষা বাজেট, বিশেষ সুবিধাভোগী সামরিক শ্রেণি এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর সামরিক আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়া সহজ হবে।
ইতিহাস আরেকটি শিক্ষাও দেয়—জুলুম ও বৈপরীত্য চিরস্থায়ী নয়। আফগানিস্তান এমন একটি ভূমি, যা সীমিত ভৌত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ওপর ঈমান এবং অবিচল প্রতিরোধের শক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য করেছে।
যদি পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামো নিজেদের ব্যর্থতার দায় আফগান জনগণের ওপর চাপাতে থাকে এবং নিরীহ আফগানদের রক্ত ঝরানোকে নিয়মিত নীতিতে পরিণত করে, তাহলে তারা ডুরান্ড লাইনের উভয় পাশে স্থায়ী ঘৃণা ও প্রতিশোধের বীজ বপন করবে। একদিন সেই ঘৃণাই পাকিস্তানের সমগ্র অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে এমন এক সংকট ও জটিলতার মধ্যে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ নাও থাকতে পারে।
বর্তমান সময়ের প্রয়োজন প্রতিবেশীর দেয়ালে অবিরাম পাথর নিক্ষেপ করা কিংবা বলির পাঁঠা খোঁজা নয়; বরং নিজের ভেতরে তাকানো এবং নিজের ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করা।





















