বিশ্ব কেন পাকিস্তানকে বিশ্বাস করে না? এর আসল কারণ কি পাকিস্তানের সুবিধাবাদী নীতি?

✍🏻 আকবার জামাল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি আবারও সক্রিয় বলে মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে একটি সম্ভাব্য মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের আকস্মিক উপস্থিতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এর অনেকগুলো স্তর উন্মোচিত হয়, যার কিছু বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, আর কিছু প্রোপাগান্ডা এবং কৃত্রিম আখ্যানের মাধ্যমে সাজানো।

পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক শাসনের মধ্যকার স্ববিরোধিতার কারণে পরিস্থিতি আগের মতোই রয়ে গেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্বে আলোচনার আয়োজন করার জন্য পাকিস্তানের প্রস্তাবকে যদিও “শান্তি প্রচেষ্টা” হিসেবে প্রশংসা করা হচ্ছে, কিন্তু এটি আসলে পূর্ণ সত্যকে আড়াল করতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো কিছু প্রতিবেদনে পাকিস্তানের এই স্ববিরোধী ভূমিকাকে জোরালোভাবে তুলে ধরছে, তবে তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করাও অন্যায্য হবে।

প্রশ্ন এটা নয় যে কেন পাকিস্তান বর্তমান মার্কিন-ইরান সংকটে মধ্যস্থতা করছে; বরং প্রশ্ন হলো, কেন তারা সবসময় এমন সংবেদনশীল মুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, অথচ অন্যদিকে আফগানিস্তানের সাথে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে রাখে। মূল প্রশ্ন হলো, এই স্ববিরোধী নীতির পেছনে পাকিস্তানের অগ্রাধিকারগুলো কী কী?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ইতিহাসের দিকে এক পলক তাকানোই যথেষ্ট। এটি কেবল কোনো সাধারণ ধারণা নয়, বরং স্পষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এক বাস্তবতা। উদাহরণস্বরূপ, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা গড়ে তোলে এবং নিজেকে এই যুদ্ধের সম্মুখসারির দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফলে পাকিস্তান ব্যাপক আর্থিক ও সামরিক সহায়তা লাভ করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই নীতির ফলাফল হিসেবে এই অঞ্চলে চরমপন্থা ও অস্থিরতা দেখা দেয়, যে মূল্য খোদ পাকিস্তানকেই দিতে হয়েছে।

১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ব্যানারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয় এবং প্রতিবেশী আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের জন্য ব্যবহারিক সুবিধা প্রদান করে; যদিও এর আগে তারা নিজেদের তালেবান সরকারের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিত। ১১ই সেপ্টেম্বরের পরের এই আকস্মিক পরিবর্তন কেবল আদর্শিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল আন্তর্জাতিক চাপ এবং স্বার্থের দ্বারা নির্ধারিত একটি কৌশল, যা বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলার দীর্ঘকালীন নীতিরই ধারাবাহিকতা মাত্র।

এই ডিগবাজি বা ইউ-টার্ন (U-turn)-এর মাধ্যমে পাকিস্তান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্য পেয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানের প্রতি এই নীতির স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাহীনতা, সন্ত্রাসবাদ এবং সামাজিক বিভাজন নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান চীনের প্রতিও স্পষ্ট ঝোঁক দেখিয়েছে, বিশেষ করে ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (CPEC)-এর কাঠামোর মধ্যে। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। পাকিস্তান উভয় শক্তিশালী দেশের সাথেই সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক দক্ষতা হিসেবে গণ্য হতে পারে, কিন্তু সমালোচকরা একে একটি স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতির অনুপস্থিতি হিসেবে দেখেন; বিশেষ করে যেহেতু সিপেক (CPEC) এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

মার্কিন-ইরান সংকটে পাকিস্তানের সম্ভাব্য কূটনীতি একই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। একদিকে ইরানের সাথে চোরাচালান, সীমান্ত সহিংসতা এবং আস্থার অভাবের মতো সমস্যা রয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান হঠাৎ করেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দাবি করছে। এই বৈপরীত্য কেবল কূটনীতি নয়, বরং এটি নীতিগত অসংলগ্নতার এক স্পষ্ট উদাহরণ, যা পাকিস্তানকে একটি সুবিধাবাদী এবং স্বার্থান্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে। মূল প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত, পাকিস্তানের কি আসলেই কোনো স্থিতিশীল ও নীতিগত পররাষ্ট্রনীতি আছে, নাকি তারা কেবল বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে শক্তিশালী দেশগুলোর ছায়ায় নিজেদের পথ পরিবর্তন করে?

যদিও এটা সত্য যে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থে কাজ করে এবং পাকিস্তানেরও সেই অধিকার আছে। কিন্তু মূল পার্থক্য হলো ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছতার মধ্যে। এমনকি দুর্বল দেশগুলোও তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, তবে তারা তা করে একটি স্পষ্ট কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে তাদের আঞ্চলিক নীতি কোনো পূর্বপরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তাৎক্ষণিক এবং প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।

তাছাড়া, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাকে একটি স্বার্থচালিত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। রাজনৈতিক অসংলগ্নতা, বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং দুর্বল অর্থনীতি—এই সমস্ত কারণ একটি স্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অস্থায়ী সুযোগের সদ্ব্যবহার করা পাকিস্তানের জন্য প্রায় একটি প্রয়োজনীয় পছন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু একই সাথে এটি দেশটিকে অসংলগ্ন এবং স্বল্পমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হিসেবে অভ্যস্ত করে তুলেছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পাকিস্তানের বিচার করা সহজ হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—পাকিস্তান কি নিজের কাজের মাধ্যমে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেনি? যখন একটি দেশ কেবল ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বারবার মিত্রতা গড়ে এবং ভাঙে, তখন তাকে সুবিধাবাদী আখ্যা দেওয়া অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এই কারণেই পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব এবং স্বল্পমেয়াদী লাভকে প্রাধান্য দেওয়া পাকিস্তানকে বারবার এমন এক পর্যায়ে নিয়ে আসে যেখানে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি আন্তর্জাতিকভাবে সত্যিই একটি নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করতে চায়, তবে দূরবর্তী সংঘাতগুলোতে মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর না করে তাকে একটি স্পষ্ট, স্থিতিশীল এবং নীতিগত পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, তাদের উচিত প্রথমে প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো। অন্যথায়, প্রতিটি নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যতই ইতিবাচক হোক না কেন, সন্দেহের চোখে দেখা হবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও দুর্বল করে তুলবে।

Exit mobile version