আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তাদের অস্ত্রের আকার বা সেনাবাহিনীর সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা হয় না; বরং তাদের কৌশলের যৌক্তিকতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় তাদের অবদান এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে তারা যে বিশ্বাস গড়ে তোলে, তার মাধ্যমে নিরূপিত হয়। তবে, যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পরিবর্তে অস্থিতিশীলতার ময়দানে প্রবেশ করে, তখন তার ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী সংকটের রূপ নিয়ে সামনে আসে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গত কয়েক দশক ধরে ঠিক এই নীতিরই প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।
এই শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ক চিন্তাভাবনায় একটি বিপজ্জনক ধারণা সর্বদা জীবিত ছিল—অঞ্চলের বিরুদ্ধে প্রক্সি বা ছায়াগোষ্ঠী ব্যবহার করা। এই নীতির অধীনে নির্দিষ্ট কিছু চরমপন্থী নেটওয়ার্ককে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আইএসআইএস-খাওয়ারিজ (ISIS-Khawarij) এমনই একটি গোষ্ঠী যার নাম আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সমীকরণে বারবার উঠে এসেছে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় তাদের আস্তানা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলো একটি জরুরি প্রশ্ন উত্থাপন করে, কেন এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা হচ্ছে না?
এই পরিস্থিতি কেবল একটি একক গোষ্ঠীর বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলের লক্ষণ। যখন চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলোকে স্থান, আস্তানা এবং সম্পদ সরবরাহ করা হয়, তখন তারা দ্রুত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা প্রকল্পের হাতিয়ারে পরিণত হয়। আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে গৃহীত অনেক পরিকল্পনা এই গোপন কেন্দ্রগুলোর ছায়া থেকেই বেরিয়ে এসেছে, এমন সব পরিকল্পনা যা স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে এবং সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইতিহাস বারবার একটি সত্য প্রমাণ করেছে, যে শক্তি অস্থিতিশীলতার বীজ বপন করে, শেষ পর্যন্ত তাকে সেই অস্থিতিশীলতার ফলই ভোগ করতে হয়। চরমপন্থা এমন এক আগুন যা কোনো সীমানা চেনে না। যখন একে রাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পুরো অঞ্চলের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে।
আফগানরা তাদের ইতিহাস জুড়ে চাপ, আক্রমণ এবং গোপন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের প্রতিযোগিতা নয়; এর জন্য ধৈর্য, বিশ্বাস এবং দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন। এই শক্তিই একটি জাতিকে অটল থাকতে এবং সব ধরনের চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করে।
আজ পাকিস্তান এক সংকটময় ঐতিহাসিক পছন্দের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। যদি দেশটির রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজ সামরিক জান্তার এই ত্রুটিপূর্ণ কৌশলের বিরুদ্ধে সংস্কারের দাবি জানাতে ব্যর্থ হয়, তবে বর্তমানে যে সংকটের কেবল আলামত দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেসব রাষ্ট্র অন্যের অস্থিতিশীলতার চক্রান্ত করে, শীঘ্রই তারা নিজেরাও সেই অস্থিতিশীলতার ঢেউয়ের মুখে পড়ে।
অঞ্চলের ভবিষ্যৎ যুদ্ধের মানচিত্র দিয়ে নয়, বরং স্থিতিশীলতার দর্শন দিয়ে নির্ধারিত হয়। যারা এই সত্যটি উপলব্ধি করবে তারাই সামনের পথ খুঁজে পাবে, আর যারা এখনও নিরাপত্তাহীনতার আগুন নিয়ে খেলছে, তারা এর শিখা থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে না।
